ইতালির টাস্কানির পাহাড়ি গ্রাম, প্রাচীন গির্জা আর শিল্পসমৃদ্ধ শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে রেনেসাঁস যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কার অসাধারণ সব কাজ। তাঁর দেয়ালচিত্রে ফুটে উঠেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, মানবদেহের সৌন্দর্য, প্রকৃতির বৈচিত্র্য এবং নতুন জীবনের সূচনা। শতাব্দী পেরিয়েও এসব কাজ দর্শকদের মুগ্ধ করে। সেই টানে এক দিনের ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এক লেখক ও তাঁর সঙ্গীরা, লক্ষ্য তিনটি শহরে শিল্পীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলো দেখা।
সকাল সাড়ে আটটায় ফ্লোরেন্স থেকে যাত্রা শুরু, গন্তব্য পূর্ব টাস্কানির সানসেপোলক্রো। সেখানে আছে পঞ্চদশ শতাব্দীতে আঁকা বিখ্যাত দেয়ালচিত্র ‘দ্য রেজারেকশন’ বা ‘পুনরুত্থান’। লেখক অ্যালডাস হাক্সলি ১৯২৫ সালের ভ্রমণবিষয়ক বই ‘অ্যালং দ্য রোড’-এ একে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি বলেছিলেন, যদিও নিজের এই মূল্যায়নকে কিছুটা হাস্যকর বলেও মেনেছিলেন।
ফ্লোরেন্সে পিয়েরোর কাজ তুলনামূলক সীমিত। উফিজি গ্যালারিতে আছে উরবিনোর ডিউক ও ডাচেসের দুটি ছোট প্রতিকৃতি, দুজনকেই দেখানো হয়েছে পাশ থেকে। তাঁর কাজের আসল বৈভব দেখতে যেতে হয় ফ্লোরেন্সের বাইরে: মন্টেরকিতে ‘মাদোনা দেল পার্তো’ এবং আরেজ্জোর সান ফ্রানচেস্কো গির্জায় ‘দ্য লেজেন্ড অব দ্য ট্রু ক্রস’। প্রায় ২২৫ কিলোমিটারের এই ভ্রমণ শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ফ্লোরেন্সে ফেরার পরিকল্পনা ছিল। গাড়ি, চালক ও একজন শিল্প-ইতিহাসবিদ গাইডের খরচ চারজনে ভাগ করায় জনপ্রতি ব্যয় হয় প্রায় ৪৫০ ডলার।
প্রথম গন্তব্য: ‘দ্য রেজারেকশন’
সানসেপোলক্রোর সিভিক জাদুঘরে, একসময়ের পৌর প্রাসাদে, রাখা আছে ‘দ্য রেজারেকশন’। ছবিটিতে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে সমাধিস্থ হওয়ার তিন দিন পর যিশুর পুনরুত্থান দেখানো হয়েছে। পিয়েরোর জন্ম ১৪১৫ সালে এই শহরেই। শহরের নাম এসেছে জেরুজালেমের পবিত্র সমাধির গির্জা থেকে।
ছবিটি টিকে থাকাই এক বিস্ময়। ১৪৬৩ সালের দিকে আঁকা দেয়ালচিত্রটি একসময় প্লাস্টারে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, কয়েক শতাব্দী পর তা আবার আবিষ্কৃত হয়। দুই মিটারের বেশি বিস্তৃত কাজটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
ছবিতে যিশুকে দেখানো হয়েছে শক্তিশালী দেহাবয়বে, পাথরের সমাধি থেকে উঠে আসছেন হাতে পতাকা নিয়ে। ত্রিভুজাকৃতির বিন্যাস আর দৃষ্টিকোণের ব্যবহার রেনেসাঁস চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য। সামনে ঘুমিয়ে থাকা সৈন্যদের একজন, বাদামি পোশাক পরা, পিয়েরোর নিজের প্রতিকৃতি বলে মনে করা হয়। যিশুর বাম দিকের ভূমি অনুর্বর, ডান দিক সবুজ ও প্রাণবন্ত, যা পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
একই জাদুঘরে আছে শিল্পীর প্রথম দিকের কাজ ‘পলিপটিক অব দ্য মিসেরিকোর্দিয়া’, যার কেন্দ্রে মেরি তাঁর অনুসারীদের নিজের পোশাকের আড়ালে আশ্রয় দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় গন্তব্য: গর্ভবতী মেরির বিরল প্রতিকৃতি
পাহাড়চূড়ার ছোট গ্রাম মন্টেরকির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ‘মাদোনা দেল পার্তো’। গর্ভবতী মেরির এমন উপস্থাপন রেনেসাঁসের ধর্মীয় শিল্পকলায় বিরল। বহু শতাব্দী ধরে সন্তানসম্ভবা নারীরা নিরাপদ সন্তান জন্মের আশায় এই ছবির কাছে এসেছেন।
ধারণা করা হয়, ১৪৫৫ থেকে ১৪৬৫ সালের মধ্যে ছবিটি আঁকা হয়, সান্তা মারিয়া দি মোমেন্তানা গির্জার একটি ছোট উপাসনাকক্ষের জন্য। শিল্পীর মা রোমানা দি পিয়েরিনো এই গ্রামেই জন্মেছিলেন, ছবিটির সঙ্গে তাঁর স্মৃতির সম্পর্ক আছে বলে মনে করা হয়।
জাদুঘরের কয়েক পা দূরে ‘লা তেরাজ্জা দি পিয়েরো’ রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার সারেন ভ্রমণকারীরা। মালিক ক্রিশ্চিয়ান দাদ্দারিও নিজেই রান্না ও পরিবেশন করেন। টাস্কানির বিশেষ হাতে গড়া মোটা পাস্তা পিচি ছিল খাবারের অন্যতম আকর্ষণ। জনপ্রতি খরচ পড়ে ৮০ ইউরো।
মূল ছবিতে পিয়েরোর কোমল তুলিতে ফুটে উঠেছে নীল পোশাকের গর্ভবতী মেরির মুখ ও দেহ। দুই পাশে দুই দেবদূত ডালিমের নকশার তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ধরেছেন। ডালিম দীর্ঘদিন ধরে উর্বরতার প্রতীক, ফলে ছবির প্রতিটি উপাদান মাতৃত্ব ও নতুন জীবনের সঙ্গে যুক্ত। গাইডের ব্যাখ্যা শুনে ছবির সামনে প্রায় ৪০ মিনিট কাটান ভ্রমণকারীরা।
তৃতীয় গন্তব্য: আরেজ্জোর সান ফ্রানচেস্কো গির্জা
আরেজ্জো কবি ও দার্শনিক পেত্রার্ক এবং শিল্পী ও জীবনীকার জর্জিও ভাসারির জন্মস্থান। এখানকার সান ফ্রানচেস্কো গির্জার দেয়ালচিত্রগুলো পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। অন্য এক শিল্পী অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
চতুর্দশ শতাব্দীর গির্জাটির বাক্কি উপাসনাকক্ষের দেয়াল ও ছাদজুড়ে ‘দ্য লেজেন্ড অব দ্য ট্রু ক্রস’, যার রং এখনো উজ্জ্বল। যে কাঠের ক্রুশে যিশুকে বিদ্ধ করা হয়েছিল, তার কিংবদন্তি এর বিষয়। মুদ্রণযন্ত্র ছড়ানোর আগে এবং পড়াশোনার সুযোগ সীমিত থাকায় গির্জার এসব চিত্রই মানুষকে ধর্মীয় কাহিনি শেখাত। পিয়েরো এখানে আলো, রং, দৃষ্টিকোণ ও মানবদেহের অনুপাতের সূক্ষ্ম হিসাব কাজে লাগিয়েছেন।
সময় পেরোনো উত্তরাধিকার
সানসেপোলক্রোর ‘দ্য রেজারেকশন’ পুনর্জন্মের প্রতীক, মন্টেরকির ‘মাদোনা দেল পার্তো’ মাতৃত্ব ও আশার প্রতিচ্ছবি, আর আরেজ্জোর চিত্রমালা ধর্মীয় কাহিনিকে দিয়েছে বিশাল রূপ। পিয়েরো দেলা ফ্রানচেস্কার কৃতিত্ব এখানেই: তিনি বিশ্বাসকে এমন দৃশ্যমান রূপ দিয়েছেন, যেখানে মানবিক অনুভূতি, প্রকৃতি ও গাণিতিক নিখুঁততা একসঙ্গে মিলেছে। সঠিক শিল্পীর হাতে একটি ছবি কীভাবে সময় পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত থাকে, তাঁর কাজ তারই প্রমাণ।












