যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফাস্টফুড চেইন কেএফসির তিন হাজারের বেশি রেস্তোরাঁয় পানীয় সরবরাহের দায়িত্ব পাচ্ছে কোকা-কোলা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল পেপসিকো। তবে ১০ বছরের সরবরাহ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে প্রতিযোগিতায় নেমে কোকা-কোলার কাছে হেরে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্টফুড বাজারে কোমল পানীয় সরবরাহের প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
টেক্সাসের প্লানোতে ইয়াম ব্র্যান্ডসের সদর দপ্তরে টানা দুই দিন ধরে কোকা-কোলা ও পেপসির পানীয়ের নমুনা পরীক্ষা করেন কেএফসির নির্বাহী কর্মকর্তা ও ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা। দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরেন। কেএফসির রেস্তোরাঁগুলোতে পানীয় বিক্রি বাড়ানো, নতুন স্বাদের পানীয় চালু করা এবং ব্যবসায়িক সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও উপস্থাপন করা হয়।
শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাবই আকর্ষণীয় মনে হলেও ভবিষ্যতে বিক্রি বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরে কোকা-কোলা কর্তৃপক্ষ কেএফসির কর্মকর্তাদের বেশি প্রভাবিত করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রতিযোগিতায় কোকা-কোলার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পানীয় বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি আনার প্রতিশ্রুতি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি

কেএফসির যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁর আয় বাড়াতে পানীয় বিক্রিকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। খাদ্যশিল্পের অনেক উদ্যোক্তার ধারণা, নতুন স্বাদের পানীয় ও আকর্ষণীয় পানীয়ের তালিকা ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি পানীয় বিক্রি থেকে তুলনামূলক ভালো মুনাফা অর্জনের সুযোগও রয়েছে।
এই বাস্তবতায় কেএফসির মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি পাওয়া কোকা-কোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। এর ফলে ফাস্টফুড খাতে প্রতিষ্ঠানটির বাজারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। শিল্পবিষয়ক সাময়িকী বেভারেজ ডাইজেস্টের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে কার্বনেটেড কোমল পানীয়ের ফাউন্টেন বিক্রির পরিমাণের প্রায় ৭০ শতাংশ কোকা-কোলার দখলে।
কেএফসির প্রতিদ্বন্দ্বী উইংসটপ ও পোপাইসের মতো দ্রুত সম্প্রসারণশীল ফাস্টফুড ব্র্যান্ডগুলোও কোকা-কোলার পানীয় পরিবেশন করে। ফলে কেএফসিতে সরবরাহের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে পেপসির জন্য এই হার বড় ধাক্কা। প্রতিষ্ঠানটির পানীয় ব্যবসা এমনিতেই চাপে রয়েছে। কেএফসির সঙ্গে সম্পর্কের ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। একসময় কেএফসির মালিকানা ছিল পেপসির হাতে। পরে ইয়াম ব্র্যান্ডসের অধীনে আসা এই ফাস্টফুড চেইনের সঙ্গে পেপসির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আগেও প্রতিযোগিতায় নেমেছিল দুই প্রতিষ্ঠান
কেএফসির আগের ১০ বছরের পানীয় সরবরাহ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ও কোকা-কোলাকে বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করেছিল ইয়াম ব্র্যান্ডস। তবে সে সময় পেপসিই চুক্তি ধরে রাখার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। শেষ পর্যন্ত পেপসি চুক্তি নবায়ন করতে সক্ষম হয় এবং বিশ্বের অধিকাংশ কেএফসি রেস্তোরাঁয় পানীয় সরবরাহের সুযোগ বজায় রাখে।

২০১৯ সালে পেপসি কেএফসির জন্য বিশেষ পানীয় মাউন্টেন ডিউ সুইট লাইটনিং বাজারে আনে। পিচ ও মধুর স্বাদযুক্ত এই পানীয়টি কেএফসির নিজস্ব বিশেষ পানীয় হিসেবে পরিচিতি পায়। নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতেও এটি ভূমিকা রাখে।
তবে চলতি বছরের শুরুতে কেএফসি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের জানায়, পানীয় সরবরাহের জন্য নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া আয়োজন করা হবে। জুন মাসে কোকা-কোলা ও পেপসির প্রতিনিধিরা ইয়াম ব্র্যান্ডসের সদর দপ্তরে পৃথক দিনে নিজেদের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই ঘণ্টা সময় পায়।
কেএফসির পানীয় বিক্রি কীভাবে বাড়ানো যায়, নতুন ধরনের পানীয় কীভাবে বাজারজাত করা সম্ভব এবং এ ক্ষেত্রে কী ধরনের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে—এসব বিষয় ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। পাশাপাশি দুই প্রতিষ্ঠানই ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের নিজেদের নতুন ও উদ্ভাবনী পানীয়ের নমুনা পরিবেশন করে।
পেপসির প্রস্তাবে কেএফসির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি নতুন ধরনের পানীয়, বরফ দেওয়া চা ও লেবুর শরবতভিত্তিক পানীয়ের মাধ্যমে বিক্রি বাড়ানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত কেএফসি কোকা-কোলাকেই বিজয়ী ঘোষণা করে।
টেক্সাসের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী তাবাসসুম মমতাজ এই সিদ্ধান্তকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মালিকানাধীন রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে প্রায় ১০০টি কেএফসি রয়েছে। তিনি কোকা-কোলার সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কোকা-কোলার খাদ্যসেবা ব্যবসায় বড় সাফল্য
কেএফসির চুক্তি কোকা-কোলার খাদ্যসেবা ব্যবসা সম্প্রসারণের ধারাবাহিক সাফল্যের অংশ। উত্তর আমেরিকায় রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা খাতের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক পরিচালনা করেন ডাগমার বগস। তাঁর নেতৃত্বাধীন দল চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হোটেলশৃঙ্খল ম্যারিয়টের সঙ্গে কোকা-কোলার বৈশ্বিক পানীয় অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখে।
কেএফসির চুক্তি পাওয়ার পর এখন দুই প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ করতে হচ্ছে। বিষয়টি সহজ নয়। কেএফসির রান্নাঘর ও খাবার পরিবেশনের জায়গায় থাকা হাজার হাজার পানীয় সরবরাহের যন্ত্র এত দিন পেপসির মালিকানাধীন ছিল। এসব যন্ত্র সরিয়ে কোকা-কোলার নতুন সরঞ্জাম বসাতে হবে। একই সঙ্গে পানীয় সরবরাহের লাইনও পরিবর্তন করতে হবে।

চুক্তি পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়ার পর কেএফসি জানিয়েছে, পানীয় তাদের মেনুকে আধুনিক করা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের ব্যবসা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে কেএফসির প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন ট্যান-গিলেসপি এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় বলেন, কোকা-কোলার সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের ফলে নতুন পানীয় উদ্ভাবন, ক্রেতাদের পরিবর্তিত রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং কেএফসি বেছে নেওয়ার আরও কারণ তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যাবে।
জানুয়ারি থেকে শুরু হবে সরঞ্জাম পরিবর্তন
চুক্তি পরিবর্তনের পরবর্তী কয়েক মাস কেএফসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকেরা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কোকা-কোলার সিরাপের দাম কত হবে এবং প্রতিষ্ঠানটি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের কী পরিমাণ ছাড় বা আর্থিক সুবিধা দেবে, তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারিতে সরঞ্জাম পরিবর্তনের কাজ শুরু হবে এবং এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।
পেপসি এরই মধ্যে নতুন রেস্তোরাঁ ব্যবসা আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবওয়ে ও ডানকিনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব অর্জন করে তারা এ ক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পেপসি এখন অন্য ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সুযোগও পর্যালোচনা করছে।

সুইট লাইটনিং হারানোর আশঙ্কায় কেএফসির ক্রেতারা
কোকা-কোলার কাছে চুক্তি হারানোর পর পেপসির একটি বিশেষ পানীয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেটি হলো মাউন্টেন ডিউ সুইট লাইটনিং। পিচ ও মধুর স্বাদযুক্ত এই পানীয়টি শুধু কেএফসিতেই বিক্রি হয়।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইউটিকা শহরের ৩৩ বছর বয়সী কলিন ভ্যানকোর্ট এই পানীয়ের নিয়মিত ক্রেতা। চুক্তি পরিবর্তনের খবর জানার পর বৃহস্পতিবার রাতে তিনি দ্রুত কেএফসিতে যান নিজের প্রিয় পানীয়টি কিনতে। পানীয়টির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত ছিলেন।
ভ্যানকোর্ট পাঁচ টুকরো চিকেন টেন্ডারের সঙ্গে সুইট লাইটনিং পান করতে পছন্দ করেন। তাঁর মতে, পানীয়টির মিষ্টি স্বাদ ও মুরগির মাংসের নোনতা স্বাদের সমন্বয় বেশ ভালো।
তিনি বলেন, কেএফসির খাবার তাঁর পছন্দ হলেও সুইট লাইটনিং না থাকলে সেখানে যাওয়ার পরিমাণ অনেক কমে যেতে পারে।
পেপসির পক্ষ থেকে ক্রেতাদের আপাতত অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। তবে কেএফসির সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে সুইট লাইটনিংয়ের উৎপাদন ও বিক্রি অব্যাহত থাকবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা আসেনি।
কোকা-কোলা ও পেপসির এই প্রতিযোগিতা তাই শুধু একটি বড় সরবরাহ চুক্তি জয়ের ঘটনা নয়। এটি ফাস্টফুড খাতে ক্রেতাদের রুচি, পানীয়ের বৈচিত্র্য, মুনাফা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের গুরুত্বও তুলে ধরছে। কেএফসির জন্য নতুন অংশীদারত্ব বিক্রি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, আর পেপসির জন্য এটি নতুন ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।












