সৌদি আরবের রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দেশটির সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও হুতিদের ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে উন্নত যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনেছে সৌদি আরব। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা এমন এক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যাদের বিপুল স্থলযোদ্ধা, নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং ড্রোন তৈরির সক্ষমতা সৌদি সামরিক শক্তির মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতিরা সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনে রিয়াদ-সমর্থিত বাহিনীগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা বাড়াতে ইরান প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, কৌশলগত পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আকাশ প্রতিরক্ষায় চাপে সৌদি আরব
ইয়েমেনে স্থলযুদ্ধে সৌদি আরব মূলত দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি অনুগত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে সৌদি যুদ্ধবিমান ও আক্রমণকারী হেলিকপ্টারগুলো এসব বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে।

তবে সৌদি প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো, শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে অনাগ্রহী হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সৌদি আরবকে মূলত গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে। গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা গ্রহণের জন্য সৌদি আরবকে আহ্বান জানান।
ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা যোগাযোগ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিষয়ে রিয়াদ প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এর পরিবর্তে সৌদি আরব তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে দেশগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়ে সহযোগিতা করছে। রোববার মিসরও সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে বলে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির মুখপাত্র উল্লেখ করেন।
সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা বলেছেন, দেশের নাগরিক ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, হুতিরা এখন বৈশ্বিক হুমকির প্রতিনিধিত্ব করছে এবং এ হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইয়েমেনে বিদেশি যোদ্ধা নেওয়ার উদ্যোগ
সৌদি আরব ইয়েমেনে নিজেদের মিত্রদের সহায়তায় বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে চায় দেশটি। তবে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে উঠছে বলে সৌদি কৌশল সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
ইয়েমেনবিষয়ক সাবেক মার্কিন উপবিশেষ দূত ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালিসন মাইনর বলেন, সৌদি আরব ভয়াবহ হামলা প্রতিরোধে সহায়তা চায়। একই সঙ্গে দেশটি দেখাতে চায়, এই সংঘাতে তারা একা নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেমন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও প্রত্যাশিত ফল পেতে সংগ্রাম করছে, তেমনি সৌদি আরবের তুলনায় অনেক ছোট শক্তি হওয়া সত্ত্বেও হুতিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। তারা চলমান ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা এবং ভূগর্ভে গভীরভাবে সুরক্ষিত উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। ফলে সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশীর বিমান হামলার মধ্যেও তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা সহ্য করেও হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে তুলনামূলক কম সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হতে পারে।
নাজরানে হামলা, বিমানবন্দরে প্রাণহানি
রোববার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নাজরানে একটি শত্রুপক্ষের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো হামলাকারী বস্তু আঘাত হেনেছে। এতে ছয়জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি বাড়ি ও তিনটি যানবাহন।
এর এক সপ্তাহ আগে সৌদি রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান-সংশ্লিষ্ট সংঘাতগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চালানো হামলাগুলোর ক্ষেত্রে এটি ছিল প্রাণহানির দিক থেকে অন্যতম গুরুতর ঘটনা। পরদিন বিমানবন্দরটিতে আরেকটি হামলায় আরও একজন যাত্রীর মৃত্যু হয় এবং ১১ জন আহত হন।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ার আগে সৌদি নেতৃত্বের প্রধান উদ্বেগ ছিল পারস্য উপসাগরের অপর পাশ থেকে সম্ভাব্য হামলা। ইরান এবং তেহরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবকে বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছড়িয়ে রাখতে হয়েছে। রাজপ্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান-সংক্রান্ত সংঘাত আবারও শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে সৌদি আরবকে একাধিক দিক থেকে সংঘাতের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের যুদ্ধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রিয়াদের ওপর চাপ বাড়ছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাইকেল র্যাটনি বলেন, একপর্যায়ে সৌদি আরবকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতেই হবে। কারণ হুতিরা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং অসম সামরিক কৌশলে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে, যা গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে।
দীর্ঘ যুদ্ধেও টিকে আছে হুতিরা
এর আগেও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের মুখে টিকে থাকার নজির রয়েছে হুতিদের। গত বছর লোহিত সাগরের প্রবেশপথে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ ও হামলার সক্ষমতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযানেও গোষ্ঠীটিকে পুরোপুরি দমন করা যায়নি।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সময় রাজধানী সানাসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর হুতিদের হটাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সাত বছর ধরে লড়াই করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র গোষ্ঠীটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দীর্ঘ যুদ্ধের পরও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলো থেকে হুতিদের সরিয়ে দেওয়া। এসব এলাকা ব্যবহার করে তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীর সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ নগর ঘাঁটি তাইজের পতন ঠেকানোও জোটের অন্যতম লক্ষ্য।
সৌদি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটির সামরিক বাহিনী পাল্টা অভিযান জোরদার করেছে। ইয়েমেনে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় একের পর এক বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি সীমান্তপারের নতুন আক্রমণ ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত সামরিক সরঞ্জাম থাকলেও সব ধরনের হামলা ঠেকানো যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। কিছু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারলে তার পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে।












