জীবনের ৬২ বছরের কর্মজীবনে হাজারো মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু তিন বছর আগে নিজের মেয়ের প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ৭৪ বছর বয়সী বব ব্রডি। তাঁর মেয়ে ক্যারোলিন চিরিচেলা বয়সে তাঁর ঠিক অর্ধেক। বাবা ও মেয়ের এই যৌথ কর্মজীবন তাঁকে শিখিয়েছে, দুই প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, কাজের ধরন ও যোগাযোগের পদ্ধতি আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেই ব্যবধান কমিয়ে আনা সম্ভব।
বব ব্রডি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে জনসংযোগ পেশায় যুক্ত। অন্যদিকে, তাঁর মেয়ে ক্যারোলিন সংগীত ও রন্ধনশিল্পে সফল ক্যারিয়ার গড়ার পর জনসংযোগ খাতে কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে বাবার কাছ থেকে মাঝেমধ্যে পরামর্শ নিতেন তিনি। পরে নিজের দক্ষতায় এককভাবে একটি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাড়তে থাকে তাঁর গ্রাহকসংখ্যাও। একপর্যায়ে মেয়েকে সহযোগিতা করার জন্য বব নিজেই তাঁর প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি খণ্ডকালীন এবং বিনা পারিশ্রমিকে কাজ শুরু করেন।
ববের দায়িত্ব মূলত পরামর্শ দেওয়া, বড় পরিসরে পরিকল্পনা নিয়ে ভাবা এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে দিকনির্দেশনা দেওয়া। পাশাপাশি অনলাইন বৈঠক, নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা, লেখা তৈরি ও গ্রাহক সংগ্রহের কাজেও অংশ নেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের মোট কাজের প্রায় ২০ শতাংশ সামলান বব। কাজের এই ভাগাভাগি নিয়ে বাবা ও মেয়ে দুজনই সন্তুষ্ট।
দুই প্রজন্ম, দুই ধরনের কর্মপদ্ধতি
ববের ভাষায়, তিনি ও তাঁর মেয়ে কর্মক্ষেত্রে যেন দুটি ভিন্ন জগতের মানুষ। ক্যারোলিন নিজের অন্তর্দৃষ্টির ওপর বেশি নির্ভর করেন। অন্যদিকে, বব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও পদ্ধতিগত চিন্তাকে গুরুত্ব দেন।
ক্যারোলিন দ্রুত চিন্তা করেন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুত কাজ শুরু করেন। কোনো গ্রাহক নতুন ধারণা দিলে সেটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা শেষ হওয়ার আগেই তিনি উৎসাহ প্রকাশ করতে পারেন। আবার কোনো নথিতে ভুল এড়াতে সংশোধনের প্রয়োজন হলে বব মনে করেন, আরও সময় নিয়ে কাজটি করা উচিত।
এ কারণে মেয়েকে প্রায়ই ধীরস্থির হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে কাজ করলে ভুলের আশঙ্কা কমে। তবে বাবার এই পরামর্শ সব সময় মেয়ের কাজে আসে না।
কাজ শেখানোর পদ্ধতিতেও রয়েছে পার্থক্য। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে বব মনে করতেন, নিজের কাজের ধরন দেখিয়ে দিলেই মেয়ে সবচেয়ে ভালো শিখতে পারবেন। কিন্তু ক্যারোলিন নিজে কাজ করে শেখার পক্ষপাতী। ফলে ববকে নিজের অভ্যাস বদলাতে হয়েছে। এখন তিনি কাজটি কীভাবে এবং কেন করতে হবে, তা বুঝিয়ে দেন। এরপর মেয়েকে নিজের মতো করে কাজটি সম্পন্ন করার সুযোগ দেন।

প্রযুক্তিতে মেয়ের দক্ষতা, অভিজ্ঞতায় বাবার শক্তি
কাজের ক্ষেত্রে দুজনের দক্ষতার জায়গাও আলাদা। বব মনে করেন, পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক কাজে এগিয়ে রাখে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট তৈরি, সার্চ ইঞ্জিনে প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়ানো কিংবা অনলাইন কর্মশালা আয়োজনের মতো বিষয়ে তিনি মেয়ের মতো দক্ষ নন।
ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ক্যারোলিন তাঁর চেয়ে এগিয়ে। ফলে বাবার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং মেয়ের প্রযুক্তিগত দক্ষতা একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ববের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু কাজের ধরন বদলানো নয়। মেয়েকে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠা একজন স্বতন্ত্র পেশাজীবী হিসেবে মেনে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝতে শিখেছেন, মেয়েকে সহযোগিতা করার অর্থ তাঁর হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
কর্মক্ষেত্রে বাবা, নাকি পরিবারের সদস্য?
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ নয়। বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে পেশাগত অংশীদারত্বে প্রবেশ করতে হলে দুপক্ষকেই নতুন ভূমিকার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। মতবিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বব ও ক্যারোলিন এ সমস্যা এড়াতে কিছু নিয়ম মেনে চলেন। বব মেয়ের কাজের প্রশংসা করেন, আবার প্রয়োজন হলে ভুলত্রুটিও তুলে ধরেন। নিজের প্রতিটি কথাকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নেন না। ক্যারোলিনকে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণেরও পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।
ববের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই ক্যারোলিন তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে বা নিজের মতামত জানাতে দ্বিধা করেননি। তাই কর্মক্ষেত্রেও মেয়ের স্বাধীন মতামত প্রকাশের বিষয়টি তাঁর কাছে নতুন নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, পারিবারিক রাতের খাবারের টেবিলে তাঁরা ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করেন না। এতে পেশাগত দায়িত্ব ও পারিবারিক সময়ের মধ্যে একটি সীমারেখা বজায় থাকে।
যোগাযোগের ধরনেও প্রজন্মগত ব্যবধান
বব যখন কর্মজীবন শুরু করেন, তখন সরাসরি দেখা করে অথবা ফোনে কথা বলেই অধিকাংশ পেশাগত যোগাযোগ সম্পন্ন হতো। কিন্তু ক্যারোলিনের প্রজন্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগে বেশি অভ্যস্ত।
এই পার্থক্য তাঁদের দৈনন্দিন কাজেও স্পষ্ট। বব চান, সপ্তাহে একবার কিংবা অন্তত দুই সপ্তাহে একবার তাঁরা নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি নিয়ে বৈঠকে বসবেন। এতে কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, দায়িত্ব ভাগ করা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো সহজ হবে।
ক্যারোলিন এ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিলেও নিয়মিত বৈঠকের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ছোট দুই সন্তানের মা হওয়ায় তাঁর সময়ের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একই সঙ্গে বব উপলব্ধি করেছেন, তাঁর প্রজন্মের তুলনায় তরুণেরা অনেক সময় কম আনুষ্ঠানিক এবং বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ফলে নির্দিষ্ট সময়সূচির পরিবর্তে সুযোগ বুঝে তাঁরা জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
বব সরাসরি দেখা করে কাজের বিষয় নিয়ে কথা বলারও পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের বাড়ির দূরত্ব আধা মাইলেরও কম। তারপরও ক্যারোলিন ই-মেইল, ফেসবুক মেসেঞ্জার কিংবা অনলাইন বৈঠকের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বেশি পছন্দ করেন।
একটি গ্রাহক হারানোর অভিজ্ঞতা
অনলাইনে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ববের উদ্বেগ আরও বেড়েছে একটি গ্রাহককে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনায়।
সম্প্রতি তাঁদের একটি গ্রাহক ই-মেইলে প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বব মনে করেছিলেন, সরাসরি দেখা করে কথা বললে গ্রাহক তাঁদের বক্তব্য ও কাজের মূল্য আরও ভালোভাবে বুঝতে পারতেন। কিন্তু ক্যারোলিন ই-মেইলের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত গ্রাহকটি তাঁদের সঙ্গে কাজ বন্ধ করে দেন।

ববের ধারণা, দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল। তবে ক্যারোলিন ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁর মতে, কাজ চলাকালে গ্রাহক নিজের অগ্রাধিকার বদলে ফেলেছিলেন এবং এমন কিছু প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। সেই পরিবর্তিত প্রত্যাশা থেকেই অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি তাঁদের কাজের ধরন ও যোগাযোগের পদ্ধতির পার্থক্যকে সামনে নিয়ে আসে। একই পরিস্থিতি দুই প্রজন্মের মানুষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন—এ অভিজ্ঞতা ববের কাছে নতুন শিক্ষা হয়ে ওঠে।
নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আস্থার জায়গা তৈরি
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বব মেয়ের কাজে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ না করার চেষ্টা করছেন। আগে যেখানে নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজের পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিতে চাইতেন, এখন সেখানে ক্যারোলিনকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেশি সুযোগ দিচ্ছেন।
বব মনে করেন, এই পরিবর্তন তাঁদের পেশাগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে বাবা ও মেয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
কাজের সুবাদে তাঁরা একে অপরের দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনকে নতুনভাবে চিনতে পেরেছেন। বেড়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও উপলব্ধিও হয়েছে আরও গভীর।
ববের কাছে এ অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর্থিক সাফল্য কিংবা পেশাগত অর্জন নয়। বরং নিজের মেয়ের সঙ্গে পাশাপাশি কাজ করার মাধ্যমে তাঁরা যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, সেটিই তাঁর কাছে বিশেষ মূল্যবান।
দুই প্রজন্মের মধ্যে কাজের ধরন, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু একে অপরকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা না করে সেই পার্থক্যকে বোঝা, স্বাধীনতাকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনমতো নিজের অবস্থান থেকে সরে আসাই পারে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে। বব ও ক্যারোলিনের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ।












