ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে টানা দুই রাত ধরে দোকানপাটে লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করা হয়েছে। কোথাও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মোটরসাইকেল, স্কুটার ও ক্যাফে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙা কাচ, খালি জুতার বাক্স ও পোড়া যানবাহনের ধ্বংসাবশেষ। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
রোববার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া টেলিভিশন ভাষণে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, দেশের রাস্তাঘাট এভাবে তছনছ হতে দেখা অসহনীয়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের পরও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট ও ভাঙচুর চলতে থাকে। সোমবার ভোর পর্যন্ত দোকানের জানালা ভেঙে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের অন্যতম ব্যস্ত বিপণিবিতান লে আলের আশপাশে কয়েকটি দোকানে হামলা চালানো হয়। উত্তর প্যারিসের বেলভিল এলাকায় একটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকানেও ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া যায়। রু দ্য রিভোলির কাছাকাছি সড়কেও মুখোশধারী ব্যক্তিদের ছোট ছোট দলকে পুলিশের ধাওয়া উপেক্ষা করে চলাচল করতে দেখা যায়।
একই সময়ে শহরের রাস্তায় সাধারণ মানুষকে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। তাঁদের পাশ দিয়েই মুখ ঢেকে লুট করা পণ্য হাতে দৌড়ে যাচ্ছিল কিশোরেরা। লে আলের কাছে বসবাসকারী ৭৩ বছর বয়সী এক নারী বলেন, দোকানের কাচ ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল একদল ব্যক্তি। পুলিশ তাঁদের ধাওয়া করছিল। অন্যদিকে কিছু লোক ময়লার পাত্র ও সাইকেলে আগুন দিচ্ছিল।

তাঁর ভাষায়, একই রাস্তায় যেন দুটি ভিন্ন জগৎ পাশাপাশি চলছিল। একদিকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা, অন্যদিকে লুটপাট ও বিশৃঙ্খলা।
বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাট—তিনটি আলাদা চিত্র
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে শনিবার থেকে অস্থিরতা শুরু হয়। তবে রাস্তায় নামা সবাই একই উদ্দেশ্যে বিক্ষোভ করছিলেন না।
একদল মানুষ স্কুলে অর্থায়ন বাড়ানো এবং সরকারি পরিষেবার উন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রবীণ ব্যক্তি ও শিক্ষক অংশ নেন।
অন্যদিকে আরেকটি দল সড়কে জ্বলন্ত সাইকেল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরের পৌর ভবনের মতো সরকারি স্থাপনাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এসব ঘটনাকে নজিরবিহীন সহিংসতা হিসেবে বর্ণনা করেন।
তৃতীয় একটি গোষ্ঠী বিক্ষোভের সুযোগে দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করতে থাকে। শনিবারের ঘটনার পর রোববার রাতেও প্যারিসের কেন্দ্রে একই ধরনের লুটপাট চলতে থাকায় পুলিশ পরিস্থিতির মোকাবিলায় চাপে পড়ে।
লুটপাটে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে ঘটনাস্থলে দেখা যাওয়া অনেককে কিশোর বলে মনে হয়েছে। আবার মুখোশ পরা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল।
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ সোমবার জানান, শনিবার রাতে দোকান ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধে আগে সম্পত্তি নষ্ট করা, চুরি, সহিংসতা ও গাড়ি চালানোসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে দণ্ডের রেকর্ড ছিল। গ্রেপ্তার অন্যদের মধ্যে ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যাঁর কাছে দোকান থেকে নেওয়া পোশাক পাওয়া যায়। এ ছাড়া চুরি হওয়া স্কুটারের চাবি বহনের অভিযোগে ২৩ বছর বয়সী এক মাতাল ব্যক্তিকে এবং মাদক ব্যবসার অপরাধে আগে দণ্ডিত ১৯ বছর বয়সী এক তরুণকে আটক করা হয়।

জুতার দোকান থেকে স্বর্ণের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—কোথাও রেহাই নেই
প্যারিসের বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় লুটপাটের চিত্র ছিল বিচিত্র। কোথাও দামি জুতার দোকানে হামলা হয়েছে, কোথাও চুলের রং করার সামগ্রীসহ ছোটখাটো পণ্য নিয়ে গেছে লুটেরারা।
মারেই এলাকার একটি দামি ক্রীড়া জুতার দোকান ভেঙে পণ্য নেওয়ার সময় কয়েকজনকে দুই হাতে জুতার বাক্স নিয়ে দৌড়াতে দেখা যায়। অন্যদিকে প্লাস দ্য লা রিপাবলিকের কাছে স্বর্ণ কেনাবেচার দোকানগুলোর জানালা ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয়। কয়েকটি দোকানে ঢোকার চেষ্টাও চলে।
রোববার সকালে এসব এলাকার অনেক দোকানের সামনে ছড়িয়ে ছিল ভাঙা কাচ ও খালি জুতার বাক্স। কোথাও দোকানের তাক সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায়।
টানা দ্বিতীয় রাতেও লুটপাট চলতে থাকায় সোমবার সকালে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। কেউ নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার চেষ্টা করেন, কেউ আবার দোকানের পণ্য সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
লে আলের কাছের একটি অ্যাডিডাস দোকান থেকে পণ্য বড় একটি ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, যাতে সেগুলো লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। দোকানের পোশাকের তাক সরিয়ে নেওয়ার সময় কর্মীরা পথচারীদের আশ্বস্ত করে বলেন, তাঁরা লুটপাট করতে আসেননি; বরং দোকানের পণ্য সরিয়ে নিচ্ছেন।
পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, পুড়ে যাওয়া যানবাহন
প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় রোববার বিকেলে শত শত মানুষের সমাগম হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালায়। রাতে বুলভার দ্য সেবাস্তোপোল এলাকায় কয়েক ডজন মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা পুলিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে কাচের বোতল ছোড়েন।
সোমবার সকালে এলাকার বিভিন্ন মোড়ে পুড়ে যাওয়া সাইকেল ও স্কুটার স্তূপ করে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সড়কের কিছু অংশে আগুনের তাপে পিচ গলে যাওয়ার চিহ্নও ছিল।

রিপাবলিক এলাকা থেকে যাওয়া সড়কগুলোর দেয়ালে বিভিন্ন স্লোগান লেখা হয়। একটি ব্যাংকের ভাঙা জানালার বাইরে লেখা ছিল, ‘ধনীদের ওপর কর আরোপ করো’।
এলাকার একটি দগ্ধ ক্যাফে-বারের সামনে দাঁড়িয়ে এক দাতব্য সংস্থার কর্মী বলেন, আশপাশের পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে এটি যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ রয়েছে, যা তাঁরা প্রকাশ করতে চাইছেন। কিন্তু ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কাছাকাছি একটি কার্যালয়ে কর্মরত বিশেষ দৃশ্যপ্রভাব নির্মাণশিল্পী জানান, পোড়ানো ক্যাফে-বারটিতে তাঁরা প্রায়ই কাজ শেষে পানীয় পান করতে যেতেন। তাঁর মতে, কিছু লুটেরা বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। প্যারিসে বিক্ষোভের পর ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা আগেও ঘটেছে, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্ষোভের পেছনে ভোগবাদ ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন
লুটপাটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের সমাজব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

লে আলের কাছে বসবাসকারী ওই প্রবীণ নারীর মতে, তরুণদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথভাবে গড়ে তুলতে না পারা এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার সমাজের সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। তাঁর বক্তব্য, সমাজ তরুণদের প্রতিনিয়ত বেশি বেশি পণ্য কেনার বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু সবার পক্ষে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষ বা সামাজিক ক্ষোভ থাকলেই লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাকে বৈধতা দেওয়া যায় না। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং সহিংসতা ও অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
প্যারিসের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পার্থক্যকে সামনে এনেছে। একদিকে শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার উন্নতির দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠী সেই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দোকানপাটে হামলা চালিয়েছে।
রাজধানীর ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সামনে এখন বড় উদ্বেগ হলো, এই অস্থিরতা কত দিন চলবে এবং স্বাভাবিক জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য কত দ্রুত ফিরবে। পোড়া যানবাহন, ভাঙা দোকান ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক শুধু সহিংসতার তাৎক্ষণিক চিত্রই তুলে ধরছে না; একই সঙ্গে বিক্ষোভের মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়লে নগরজীবন কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, সেটিও স্পষ্ট করছে।












