ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ দাঙ্গা, লুটপাট ও সহিংসতার পর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্ব নতুন করে গভীর সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর দেওয়া ভাষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দল থেকে শুরু করে নিজের রাজনৈতিক শিবিরের সাবেক নেতারাও বলছেন, দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর জনপ্রিয়তা, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
রোববার রাতে এলিসি প্রাসাদে নিজের কার্যালয় থেকে জাতির উদ্দেশে আট মিনিটের ভাষণ দেন ম্যাক্রোঁ। ফ্রান্সজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় তিনি ‘ক্ষোভ ও লজ্জা’ প্রকাশ করেন। কিন্তু তরুণদের গভীর উদ্বেগের কথা স্বীকার করলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি, মন্ত্রিসভায় রদবদল কিংবা অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের ঘোষণা দেননি। পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা আয়োজনের নির্দেশ দেন এবং বিরোধী রাজনীতিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে তাঁর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক সংকটের কোনো স্পষ্ট সমাধান খুঁজে পাননি বিরোধীরা। তাঁদের অভিযোগ, দেশ যখন সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত, তখন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রয়োজন ছিল কার্যকর সিদ্ধান্ত ও দৃশ্যমান নেতৃত্ব।
সহিংসতায় বিপর্যস্ত ফ্রান্স, প্রশ্নের মুখে সরকার
সপ্তাহান্তের সহিংসতায় একটি পৌরসভা ভবনে আগুন দেওয়া হয়, দুই হাজারের বেশি দোকানে লুটপাট চালানো হয় এবং দুই হাজার তিন শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। আহত হন প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য।
শনিবার রাস্তায় নেমেছিলেন প্রায় পাঁচ লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে তাঁদের ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হিসেবে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের ব্যবহার পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্কুলশিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও পুলিশকে বলপ্রয়োগ করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণগুলো মোকাবিলা করা।
ডান-বাম সব পক্ষের তীব্র আক্রমণ
ম্যাক্রোঁর ভাষণের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় সর্বত্রই সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরিবেশবাদী দল গ্রিনসের নেত্রী মারিন টঁদেলিয়ে বলেন, নিজের ভুলের দায় স্বীকার করার সামান্য চেষ্টাও না করে ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সবাইকে এমনভাবে ডেকেছেন, যেন তাঁরা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সামনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী।
চরম ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা জর্দান বারদেলা ভাষণটিকে হতাশাজনক বলে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, ফরাসি জনগণকে বলার মতো ম্যাক্রোঁর আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
দলটির প্রভাবশালী নেত্রী মারিন লে পেন বলেন, ফ্রান্স সহিংসতা ও সরকারের অক্ষমতার মাঝখানে আটকে পড়েছে।
মধ্য-ডানপন্থী নেতা ব্রুনো রেতাইয়োও মনে করেন, ম্যাক্রোঁ পরিস্থিতির চাপে সম্পূর্ণভাবে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর অভিযোগ, বিক্ষোভ নিজে থেকেই থেমে যাবে—এমন আশায় সরকার নিষ্ক্রিয়তা ও পুলিশের কঠোরতার ওপর নির্ভর করছে।
ম্যাক্রোঁর সাবেক প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার ফিলিপও আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দেশে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। তাঁর বক্তব্য, ফ্রান্সকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
নেতৃত্বের ধরনই কি ম্যাক্রোঁর দুর্বলতার কারণ?
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, যেখানে ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচিত হবেন, সেখানে বিভিন্ন দলের নেতারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইবেন। কিন্তু এবার সমালোচনার তীব্রতা শুধু নির্বাচনী রাজনীতির অংশ নয়; এটি প্রেসিডেন্টের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকেও তুলে ধরছে।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর ম্যাক্রোঁ নিজেকে এমন এক প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যিনি দৈনন্দিন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তাঁর এই নেতৃত্বের ধরনকে তখন ‘জুপিটারীয়’ বলে বর্ণনা করা হতো। রোমান পুরাণের দেবতা জুপিটারের মতো ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছিল এই কৌশলের মূল ধারণা।
কিন্তু এলিসি প্রাসাদে প্রায় নয় বছর কাটানোর পর সেই কর্তৃত্বপূর্ণ নেতৃত্বের ধরন অনেকের চোখে অহংকারে রূপ নিয়েছে। সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা ম্যাক্রোঁকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, বাড়ছে গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক
ফ্রান্সের সংসদে কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ম্যাক্রোঁর সরকার বিভিন্ন আইন পাস করাতে সাংবিধানিক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংসদে সরাসরি ভোট ছাড়াই আইন কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সরকারকে বাড়তি চাপে ফেলেছে। ফ্রান্সের জাতীয় ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের ১১৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৯৪৬ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে। একই সময়ে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ১ শতাংশে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যেও অন্যতম বেশি।
এমন পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ কমাতে সরকারের হাতে বাড়তি অর্থের সুযোগ সীমিত। অথচ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণই হলো দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে ক্রমবর্ধমান অসুবিধা।
ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অনাস্থা এবং সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লাভবান হতে পারে চরম ডানপন্থীরা
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে চরম ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি। আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি দীর্ঘদিন ধরেই সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ম্যাক্রোঁর দলের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনীতিক জঁ-বাতিস্ত মোরো মনে করেন, প্রেসিডেন্ট এখনো বিশ্বাস করেন যে তিনি পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারবেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মারিন লে পেন সরাসরি এলিসি প্রাসাদে যাওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
এই মূল্যায়ন ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের ক্ষোভ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নির্বাচনে ভোটারদের একাংশ আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষ নিতে পারে।
সামনে কঠিন পরীক্ষা ম্যাক্রোঁর
ম্যাক্রোঁর সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয়, তরুণদের উদ্বেগ এবং সরকারের প্রতি মানুষের অনাস্থার মতো গভীর সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা পুলিশি পদক্ষেপ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন এমন সিদ্ধান্ত, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে এবং সরকারের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল দাঙ্গা ও লুটপাটের সংকট নয়; এটি ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বের সক্ষমতা, সরকারের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়েও বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তিনি কতটা সফল হবেন, তার ওপর আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে।












