ইংল্যান্ডের ইংলিশ ট্যুরিং অপেরার এবারের শরৎকালীন আয়োজনের মূল বিষয় পুরাণ। এই আয়োজনের অপেরাগুলোতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে এমন নারীদের গল্প, যাঁদের পুরুষ সঙ্গীরা মাঝপথে ছেড়ে চলে যান। ক্রিস্টোফার গ্লুকের ‘অরফিউস অ্যান্ড ইউরিডাইসি’র পাশাপাশি মঞ্চস্থ হচ্ছে দুটি ভিন্নধর্মী প্রযোজনা: এলেনা ল্যাঙ্গারের ‘অ্যারিয়াডনি’ এবং হেনরি পার্সেলের ‘ডিডো অ্যান্ড এনিয়াস’। লন্ডনের হ্যাকনি এম্পায়ারে পরিবেশিত এই দ্বৈত আয়োজন সমালোচকের মূল্যায়নে পেয়েছে তিন তারকা।
পরিত্যক্ত অ্যারিয়াডনির একাকিত্ব
‘অ্যারিয়াডনি’ মূলত একটি একক সংগীতনাট্য। কবি গ্লিন ম্যাক্সওয়েলের ‘অ্যারিয়াডনি টু থিসিউস’ কবিতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই রচনা প্রথম মঞ্চস্থ হয় ২০০২ সালে। এবার নামভূমিকায় জেসিকা কেইল কণ্ঠ ও অভিনয়ে পরিত্যক্ত এক নারীর বেদনা বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
পরিচালক আনা মরিসের মঞ্চায়নে একক চরিত্রের এই গল্পে ছয়জন শিল্পী অংশ নিয়েছেন। ফলে অ্যারিয়াডনির পরিত্যক্ত হওয়া কেবল নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা থাকেনি, মঞ্চে তা হয়ে উঠেছে চলমান নাটকীয় অভিজ্ঞতা।
শুরুতে দেখা যায়, থিসিউস ঘুমন্ত অ্যারিয়াডনিকে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, দুজনকে বেঁধে রাখা লাল সুতো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। অ্যারিয়াডনি জেগে ওঠার পরও থিসিউসকে মঞ্চে দেখা যায়। কখনো তিনি ছায়ায় পায়চারি করেন, কখনো অ্যারিয়াডনির ঘূর্ণায়মান বিছানা ঘুরিয়ে দেন।
চার বাদ্যযন্ত্রে আবেগ
ল্যাঙ্গারের সংগীতে ওবো, বেহালা, ভায়োলা ও চেলো, এই চারটি বাদ্যযন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কোনো কন্ডাক্টর ছাড়াই শিল্পীরা পরিবেশনা চালিয়েছেন। উঁচু স্বরের সুর অ্যারিয়াডনির কণ্ঠকে গভীরতা দিয়েছে, যেন সমুদ্রের ঢেউয়ে আলোর খেলা সংগীতে অনুভব করা যায়।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা অ্যারিয়াডনির দৃশ্যকে অর্থবহ করেছে জোসেফ হর্নসবির আলোক পরিকল্পনা। তবে শেষ দৃশ্যে অ্যারিয়াডনিকে নিজের ত্বকের ভেতর দিয়ে লাল সুতো সেলাই করার প্রতীকী কাজ করতে দেখা যায়। ভাবনাটি আকর্ষণীয় হলেও এতে জেসিকা কেইলের মনোযোগ কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে বলে মনে হয়েছে সমালোচকের।
‘ডিডো অ্যান্ড এনিয়াস’-এ কিশোরী মানসিকতা
রেবেকা মেল্টজারের নির্দেশনায় পার্সেলের ‘ডিডো অ্যান্ড এনিয়াস’ সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে। মঞ্চ অনেকটা বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের মতো। ডিডো ছাড়া প্রায় সব চরিত্রের পরনে ছাইরঙা ব্লেজার ও ভাঁজযুক্ত স্কার্ট। এর পেছনে অপেরাটির ইতিহাস রয়েছে: শুরুতে এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করেছিল।
জাদুকরীর চরিত্রে লিডিয়া শরিফের অভিনয়ে ফুটে উঠেছে স্কুলের প্রভাবশালী, কর্তৃত্বপরায়ণ কিশোরীর ভঙ্গি। ডিডোর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বেলিন্ডার চরিত্রে ইসাবেল অ্যাটকিনসন ছোট সানগ্লাস পরে ডাইনিদের দলে যোগ দেন। এতে দলবদ্ধতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক নিপীড়নের আবহ তৈরি হয়েছে। ডিডোকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, আর তাতে মাইকেল ল্যাফার্টির কোমল কণ্ঠের এনিয়াসও দায় এড়াতে পারে না।
অনুপস্থিত রাজকীয় ট্র্যাজেডি
সংগীত পরিচালক অ্যালেক্স রবিনসন হার্পসিকর্ড বাজিয়ে অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করেছেন। কিছু সৃজনশীল মুহূর্ত থাকলেও সামগ্রিক স্থির গতি সেই বৈচিত্র্যের প্রভাব কমিয়েছে। তবু সামান্থা প্রাইসের অভিব্যক্তিপূর্ণ ডিডো এবং মেল্টজারের শক্তিশালী মঞ্চ পরিচালনা প্রযোজনাটিকে আকর্ষণীয় করেছে।
সমালোচকের মতে, ঘাটতি এক জায়গায়। ডিডোকে শুরু থেকেই নিপীড়নের শিকার হিসেবে দেখানোয় তাঁর রাজকীয় মর্যাদা যথেষ্ট ফোটেনি। ডিডো কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের শিকার নন, তিনি একজন রানি। মানুষের আবেগের সংঘাত আর দেবতাদের খেয়াল কীভাবে একজন রানি ও তাঁর রাজ্যের পতন ডেকে আনে, সেই বৃহত্তর ট্র্যাজেডি এখানে স্পষ্ট হয়নি।
পুরাণের শক্তি কেবল প্রেম, বিচ্ছেদ বা বিশ্বাসঘাতকতার গল্পে নয়। ব্যক্তিগত আবেগ যখন ক্ষমতা, নিয়তি ও সমাজের বৃহত্তর পরিণতির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তখনই তা মহাকাব্যিক হয়ে ওঠে। ইংলিশ ট্যুরিং অপেরার এই মঞ্চায়নে সেই গভীরতাই কিছুটা অনুপস্থিত।
আগামী ২৪ অক্টোবর ইংল্যান্ডের বাক্সটন অপেরা হাউসে প্রযোজনাটি মঞ্চস্থ হওয়ার কথা। এরপর ইংলিশ ট্যুরিং অপেরা অন্যান্য স্থানেও এটি নিয়ে যাবে।












