সাপ সাধারণত এঁকেবেঁকে চলার জন্য পরিচিত। কিন্তু শিকারির আক্রমণের মুখে পড়লে একটি ক্ষুদ্র সাপ বেছে নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল। শরীরকে ফাঁসের মতো বাঁকিয়ে সামনের দিকে ডিগবাজি খেয়ে গড়িয়ে যেতে পারে এটি। এভাবে ঘণ্টায় প্রায় ৯ মাইল বা ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার গতিতে ছুটে বিপদ এড়ায় সাপটি। স্বাভাবিকভাবে এঁকেবেঁকে চলার তুলনায় এই কৌশলে তার গতি প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়।
জাপানের বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এই অস্বাভাবিক চলনপদ্ধতির রহস্য উন্মোচন করেছেন। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, দ্রুত গড়িয়ে যাওয়ার সময়ও সাপটি কীভাবে মাথা স্থির রেখে সামনের দিকের অবস্থান বুঝতে পারে। প্রাণিজগতের আত্মরক্ষার ব্যতিক্রমী কৌশলগুলোর একটি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে এই গবেষণা।
শরীরকে চাকার মতো ব্যবহার
গবেষকেরা টোহো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপটির চলাচল বিভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করেন। দ্রুতগতির এসব দৃশ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখতে পান, সাপটি শুধু শরীর গুটিয়ে গড়িয়ে যায় না; বরং কয়েকটি ধারাবাহিক শারীরিক কৌশল ব্যবহার করে।
প্রথমে লেজের সাহায্যে শরীরকে সামনের দিকে ও কিছুটা ওপরে ছুড়ে দেয় সাপটি। এরপর মাথা স্থির রেখে শরীরের বাকি অংশকে মাথার ওপর দিয়ে দ্রুত ঘুরিয়ে একটি ফাঁসের মতো আকৃতি তৈরি করে। এ সময়ও মাথা সামনের দিকে থাকে। শরীরের বেশির ভাগ অংশ মাথার সামনে চলে এলে সেটি ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো বাঁক নেয়। এভাবেই সাপটি সামনের দিকে গড়িয়ে পড়ে।
একবার এই ঘূর্ণন শেষ হলে আবার লেজের সাহায্যে নিজেকে সামনের দিকে ছুড়ে দেয়। একই কৌশল বারবার প্রয়োগ করে দ্রুত এগিয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণ করা দৃশ্যে দেখা গেছে, এত দ্রুত চলার পরও সাপটি মাত্র ২০ সেন্টিমিটার চওড়া পথ ধরে চলতে পারে। অর্থাৎ, এটি শুধু শরীর গুটিয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; চলার দিক নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে বিশেষ দক্ষতা।

পাতার নিচে লুকিয়ে থাকা নিশাচর সাপ
গবেষণায় আলোচিত সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম পসিউডোর্যাবডিয়ন লংগিসেপস। এটি পসিউডোর্যাবডিয়ন গণের অন্তর্ভুক্ত একটি নিরীহ সাপ। সাধারণত এর দৈর্ঘ্য ১৭ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সাপের দেখা মেলে।
এরা নিশাচর। দিনের বড় অংশ কাটায় শুকনো পাতার স্তূপের মধ্যে কিংবা গাছের গুঁড়ি ও পাথরের নিচে লুকিয়ে। বিপদের মুখে সাপটির গড়িয়ে পালানোর আচরণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম নথিবদ্ধ হয় ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। মালয়েশিয়ার গবেষকেরা রাতে পাহাড়ি সড়কে সাপটির দেখা পেয়েছিলেন। বিরক্ত বা আতঙ্কিত হওয়ার পর সাপটি শরীরকে ফাঁসের মতো বাঁকিয়ে গড়িয়ে পালিয়ে যায়।
নতুন গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজিতে। এতে এই অস্বাভাবিক চলনপদ্ধতির পেছনে থাকা শারীরিক কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্য প্রাণীরাও গড়িয়ে পালায়

বিপদ এড়াতে শরীর গুটিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার কৌশল অন্য প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। বনরুই শরীরকে শক্ত বলের মতো গুটিয়ে নিতে পারে। টেপুই অঞ্চলের কিছু ব্যাঙও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শরীরের নিচে ভাঁজ করে গড়িয়ে পড়ে। তবে এসব প্রাণী সাধারণত ঢালু ভূমি বা মাধ্যাকর্ষণের সহায়তায় গড়ায়।
মরক্কোর ফ্লিক-ফ্ল্যাক মাকড়সা মরুভূমির বালুর ওপর সামনে বা পেছনে ধারাবাহিক ডিগবাজি খেয়ে চলতে পারে। স্বাভাবিকভাবে দৌড়ানোর চেয়ে এই পদ্ধতিতে তার গতি বেশি হয়। অন্যদিকে, নামিবিয়ার গোল্ডেন হুইল মাকড়সা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে ঢাল বেয়ে চাকার মতো গড়িয়ে নামে।
ক্ষুদ্র এই সাপের বিশেষত্ব হলো, ঢালু ভূমির ওপর নির্ভর না করেও সে নিজের শরীরের শক্তি ও নিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণন ব্যবহার করে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। ফলে প্রাণিজগতে চলাচল ও আত্মরক্ষার বৈচিত্র্য সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন একটি উদাহরণ হাজির হয়েছে।
ক্ষুদ্র সাপটির এই কৌশল দেখায়, শিকারির হাত থেকে বাঁচতে প্রকৃতি কীভাবে পরিচিত চলনপদ্ধতির বাইরেও কার্যকর সমাধান তৈরি করেছে।












