ইতালির মিলান শহরে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাটের পর নিরাপত্তা জোরদার করতে আরও ৫০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। সহিংসতায় দোকানপাট ভাঙচুর, পণ্য লুট এবং পুলিশ সদস্যদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ ইউরোর বেশি। নতুন করে হামলার আশঙ্কায় শহরের বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল দোকানও বন্ধ রাখা হয়েছে।
সোমবার ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মিলানকে লুটপাট ও সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে সরকার এবার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ডানপন্থী লিগ পার্টির এই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা পাঠানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত আসে। সহিংস বিক্ষোভকারী ও কিশোর অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির সরকার।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ, পরে লুটপাট

সপ্তাহান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে মিলানে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রথমদিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। মুখ ঢাকা শত শত তরুণ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তারা বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেডে আগুন দেয় এবং শহরের কেন্দ্রীয় দুওমো চত্বরের আশপাশে দোকানপাটে হামলা ও লুটপাট চালায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে। হামলার শিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ডেকাথলন, আর্কটেরিক্স ও ভোডাফোনের দোকান রয়েছে। বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনের অংশ বন্ধ করে দেয়।
পুলিশের হিসাবে, শুধু রোববারই ২৭১ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষে ১৪ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে ইতালির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
১০ লাখ ইউরোর বেশি ক্ষয়ক্ষতি
স্থানীয় কৌঁসুলিরা এই সহিংসতাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করেছেন। দোকানের কাচ ভাঙা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং পণ্য লুটের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০ লাখ ইউরো ছাড়িয়েছে। তবে বিক্রি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
নতুন করে হামলার আশঙ্কায় সোমবার চ্যানেল, হারমেস ও পমেলাতোর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান বন্ধ রাখা হয়। আরও কয়েকটি অভিজাত বিপণিবিতান তাদের প্রদর্শনীতে রাখা পণ্য সরিয়ে ফেলে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

সালভিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে সংঘর্ষে জড়ানোর অভিযোগ তোলেন। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে সহিংসতা ও লুটপাটের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
তিনি বলেন, এই ঘটনাকে শুধু সামাজিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক আটক এবং লুটপাটের ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের সুযোগ বাড়াতে কঠোর আইন প্রণয়নের পক্ষেও মত দেন তিনি।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। সহিংস তরুণ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ দ্রুত কার্যকর করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
মিলান মেয়রের উদ্বেগ, ইউরোপজুড়ে সহিংসতার বিস্তার
মিলানের মেয়র জিউসেপ্পে সালা শহরের ধ্বংসযজ্ঞকে অগ্রহণযোগ্য ও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

মিলানের এই সহিংসতা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান বিক্ষোভ ও অস্থিরতার বৃহত্তর প্রবণতার মধ্যেই ঘটল। প্রতিবেশী ফ্রান্সেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা ঘিরে বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয় এবং সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু কয়েকটি এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারফিউ জারির ঘোষণা দেন।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে রয়েছেন। ফলে মিলানসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং জনঅসন্তোষ মোকাবিলা করা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।












