১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে সহিংসতা ফ্রান্সের জনশৃঙ্খলার অবনতির পাশাপাশি সরকারের গোয়েন্দা মূল্যায়ন, নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতার জবাবে আরও কঠোর দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর সরকার যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না, তা এখন স্পষ্ট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ নিজের দপ্তরের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সরকার শুধু একজন মন্ত্রীর দায়িত্বের প্রশ্ন এড়ায়নি; নিজেদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভুল পর্যালোচনার সুযোগও সীমিত করেছে।
ঘটনাটির পরিণতি ছিল ভয়াবহ। প্যারিসে দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মার্সেই ও লিয়োঁর মেয়ররা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লিমোজে নগর ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় শহরবাসী শোক ও বিস্ময়ের মুখে পড়েছেন। একই দিনে সাঁত-এতিয়েন ও মুলুজে ১৭ বছর বয়সী দুই কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে। তাদের একজনের হাত এবং অন্যজনের চোখ নষ্ট হয়েছে। এসব ঘটনা দেখায়, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মূল্য কেবল রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানে।

গোয়েন্দা সতর্কতা ছিল, কিন্তু প্রস্তুতি ছিল না
এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ পূর্বাভাস দিতে না পারা। ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল, বিক্ষোভে আকস্মিক, অপরিকল্পিত ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা এবং শহরাঞ্চলে সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার জানত, সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি অপরাধীরাও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। কিন্তু এসব গোষ্ঠীর সম্ভাব্য উপস্থিতি ও সংখ্যা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সরকার প্রকৃত সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুমান করেছিল।
এই ভুল মূল্যায়নের ফলে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি। কিছু পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যরাও ঝুঁকির মুখে পড়েন। একই সঙ্গে দ্রুত চলাচলকারী যেসব বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী সহিংসতা ও লুটপাটে অংশ নিয়েছিল, তাদের মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিকল্পনার সামঞ্জস্য ছিল না।
এখানে প্রশ্নটি শুধু পুলিশের সংখ্যা নিয়ে নয়। গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর তা কীভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুযায়ী বাহিনীকে কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি বদলালে কৌশল কত দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাভাসের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও যথাযথ প্রস্তুতি না থাকলে সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানো যায় না।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর স্বীকারোক্তি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ প্রথমে দাবি করেছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা হয়নি। পরে তাঁকে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা স্বীকার করতে হয়। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে বিক্ষোভের শুরুতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও ভাঙচুরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় একই এলাকায় আটকে রাখার কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে শনাক্ত করা এবং সাধারণ বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সরকার বিক্ষোভে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেছে। শ্রমিক সংগঠন বা প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন—এ কথা সত্য। কিন্তু এ ধরনের বিক্ষোভ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তাই বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতিকে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানো যায় না।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থীদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনাকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, কেউ নিহত না হওয়াটা সৌভাগ্যের বিষয়। এই মন্তব্য পরিস্থিতির গুরুতরতা প্রকাশ করে। রাষ্ট্র যদি নিজেই মনে করে যে প্রাণহানি অল্পের জন্য এড়ানো গেছে, তাহলে নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা অপরিহার্য।
বিক্ষোভকে শুধু নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা
সরকারের আরেকটি বড় ভুল হলো, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া। অতীতের বিভিন্ন বিক্ষোভের মতো এবারও আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে পাশ কাটিয়ে পরিস্থিতিকে মূলত শহরাঞ্চলের সহিংসতার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। এর ফলে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পার্থক্য করার বদলে পুরো পরিস্থিতিকে নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করার প্রবণতা বেড়েছে।
জননিরাপত্তা রক্ষার জন্য পুলিশের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তারও স্পষ্ট সীমা ও জবাবদিহি থাকা দরকার। ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বিস্ফোরকজাতীয় গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপকারী অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বিশেষত যখন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৬ অক্টোবর পুলিশকে সংযমের নির্দেশ না দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এমন অবস্থান নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে। তবে তা সব পরিস্থিতিতে কার্যকর কৌশলের বিকল্প হতে পারে না। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ বাড়াতে পারে, সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং পুলিশের ওপর জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করতে পারে।
প্রায় ছয় হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তাঁদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এত বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের ঘটনা বিচারব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্রেপ্তার নিজে থেকে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রমাণ নয়। গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি নিশ্চিত করাই আইনের শাসনের মূল শর্ত।

দমননীতি কি সংকট আরও বাড়াবে?
১৭ অক্টোবরের ঘটনার পর সরকার যেসব পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই শাস্তিমূলক। ভাঙচুরকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার আইন, সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, কারফিউ এবং পুলিশি হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। সহিংসতা ঠেকাতে পরিস্থিতিভেদে কিছু কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল যদি কেবল নিষেধাজ্ঞা ও দমনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সমস্যার মূল কারণ অমীমাংসিত থেকে যাবে।
সরকারের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হলো, অপরাধ দমন এবং বৈধ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখলে রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা বাড়তে পারে। রাজনৈতিক অসন্তোষের বৈধ প্রকাশের পথ সংকুচিত হলে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরও বেশি সমর্থন আদায়ের সুযোগ পেতে পারে।
ফ্রান্সের বর্তমান সংকটের বিপজ্জনক দিক এখানেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা স্বীকার করে তা সংশোধনের পরিবর্তে যদি সরকার আরও কঠোর বলপ্রয়োগের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে এক দফার সহিংসতা পরবর্তী দফার সহিংসতার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তখন প্রতিটি নতুন বিক্ষোভকে আরও বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখা হবে, আর প্রতিটি কঠোর পদক্ষেপ নতুন ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা মানে শুধু বেশি পুলিশ মোতায়েন বা আরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা নয়। এর অর্থ হলো, সম্ভাব্য সংকট আগে থেকে শনাক্ত করা, উপযুক্ত প্রস্তুতি নেওয়া, প্রয়োজনে কার্যকর ও সংযতভাবে বলপ্রয়োগ করা এবং ভুল হলে তার দায় স্বীকার করে সংশোধন করা। ফ্রান্সের সরকারের সামনে এখন এই চারটি কাজই জরুরি।
১৭ অক্টোবরের সহিংসতা দেখিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার পর শুধু কঠোর বক্তব্য ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজনৈতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় না। সরকারের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা। এই তিনটি লক্ষ্যকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখলে সংকটের সমাধান হবে না। বরং নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে ফ্রান্স আরও গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।












