ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা, রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো এবং ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরে। ২০ অক্টোবর মুম্বাইয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জানান, দুই দেশের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে কয়েকটি বিষয়ের সমাধান বাকি রয়েছে।
রুবিওর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটনের কাছে ভারতের গুরুত্ব শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নয়াদিল্লির ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে এই ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও রাশিয়ার তেল কেনা, বাণিজ্য শুল্ক এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার মতো বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের জটিলতা রয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির পথে শেষ বাধাগুলো
রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাঁর ভাষায়, চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে কয়েকটি বিষয়ের সমাধান বাকি। শিগগিরই সমঝোতা হতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে সফরের সময়ই চুক্তি স্বাক্ষর হবে কি না, তা নিশ্চিত করেননি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার সময় ভারতের রুশ তেল কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের বিষয়ে মার্কিন অবস্থানে সাময়িক পরিবর্তন আসায় আলোচনার একটি বাধা কমেছে। তবে চুক্তির সব শর্তে সমঝোতা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
ভারত বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। রুবিও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কোয়াডে ভারতের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও বাড়ানো দরকার।
রুশ তেলের বিকল্প খুঁজছে ওয়াশিংটন
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জ্বালানি। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন চায়, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎস আরও বহুমুখী করুক।
রুবিও জানান, ভারত ইতিমধ্যে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহের উৎস বহুমুখী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার তেল নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে আলোচনায় ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিশোধন এবং দেশটিতে তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার পরিকল্পনার কথা জানান রুবিও। তিনি বলেন, ভারী অপরিশোধিত তেল পরিশোধনে ভারতের উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। রিলায়েন্স অতীতেও ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে কাজ করেছে।
তবে এই পরিকল্পনার পথে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। রুবিও স্বীকার করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হলে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, ভেনেজুয়েলার তেল একাই বিশ্ববাজারের ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। তবে সময়ের সঙ্গে সরবরাহ বাড়লে তা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
ইউক্রেন নিয়ে বিরোধ, সহায়তা বন্ধের দাবি অস্বীকার
ভারত সফরের সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সেদিন ৪৫ মিনিট কথা বলেছেন বলে জানান রুবিও। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করেনি এবং ইউক্রেনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে সামরিক সহায়তা আটকে রাখা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থায়নে কেনা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সরঞ্জামের একটি চালান এখনো ইউক্রেনে পৌঁছায়নি—এমন সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেননি। তাঁর ব্যাখ্যা, যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের সামরিক স্থাপনা এবং অংশীদারদের নিরাপত্তার চাহিদা বিবেচনা করে অস্ত্রের মজুত বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উন্নত প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও চালান বিলম্বের বিষয়টি উঠে এসেছে।
রুবিওর মতে, ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে উত্তেজনার একটি কারণ হলো, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের হতাশা। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতা ছাড়া যুদ্ধের অবসান সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন। তাঁর বক্তব্যে যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ধ্বংস এবং জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক চাপের বিষয়গুলোও উঠে আসে।
কৌশলগত সম্পর্কের বিস্তৃত হিসাব
রুবিওর ভারত সফর শুধু বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ, রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে ওয়াশিংটন একদিকে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্তেও প্রভাব রাখতে চাইছে। কিন্তু ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাহিদা ও কৌশলগত স্বার্থও এই সমীকরণের অংশ। ফলে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও সব বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্য হওয়া নিশ্চিত নয়।
রুবিওর বক্তব্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনাও এখনো আলোচনাধীন। এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞার কাঠামো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
রুবিওর ভারত সফরে বাণিজ্য চুক্তি, ভেনেজুয়েলার তেল এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি।












