একজন সাংবাদিক বা লেখকের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি , কোনো অনুজপ্রতিম লেখক বা সাংবাদিককে নিয়ে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে কিছু লেখা। সাংবাদিক আমীর খসরু বয়সে আমার চেয়ে বেশ ছোট। কিন্তু রিপোর্টার হিসেবে সংবাদ ও ইত্তেফাকে কাজ করার সময় সে তার জন্মস্থান বরিশালের নদীতীরের পলিমাটিতে জন্ম নেওয়া গাছের মতো তর তর করে এগিয়ে গিয়েছিল। সে সময় আমীর খসরুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল মূলত আড্ডার।
এর কিছুদিন পর দেশের সর্বাধিক প্রচারিত সাপ্তাহিকগুলোর অন্যতম যায়যায়দিনে আট বছর নয় মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে একসঙ্গে লিখেছি। কখনো সম্পাদক শফিক রেহমান আমার লেখা, কখনো অন্য কোনো সাংবাদিক বা রাজনৈতিক কর্মীর লেখা প্রচ্ছদ কাহিনি হিসেবে চিহ্নিত করে দিলেও সব লেখা পড়ার পর আমীর খসরুর লেখাকেই প্রচ্ছদ কাহিনি করার সুপারিশ করেছি। শফিক রেহমান আমার পছন্দের পক্ষে যুক্তি দিতে বলতেন। যুক্তি গ্রহণযোগ্য হলে তিনি তা মেনে নিতেন।
আমীর খসরুর লেখায় সম্পাদনার তেমন কিছু থাকত না। তার লেখা ছিল ঝরঝরে। কিন্তু একবার তার একটি লেখা ছাপা হওয়ার পর সে বেশ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, ‘আমার লেখার প্যারাগুলো ভেঙেছে কে?’ খসরুকে চা দিতে বলে অন্য কথাবার্তা বলার পর তাকে বললাম, ‘শফিক ভাই নন, আমিই প্যারাগুলো ছোট করে শফিক রেহমানের কাছে পাঠিয়েছিলাম।’ বুঝলাম, আমীর খসরু কিছুটা বিরক্ত হয়েছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর সে এবার লেখাটি আমার কাছে দিতে দিতে বলে, ‘ব্রাদার, বানান আর প্যারা দেখে দিয়েন।’ হাসতে হাসতে বললাম, ‘বানান দেখার জন্য তো প্রুফরিডার বাঁধন আছে।’ গোটা যায়যায়দিনে একটি মাত্র চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করার রীতি ছিল। আর কিছু না বলে মূল কপিতেই কয়েকটি প্যারার বিভাজন চিহ্নিত করে দিলাম।
এরপর থেকে দেখলাম, আমাদের সবার গুরু আতাউস সামাদ ভাইয়ের লেখার মতোই খসরুর লেখার প্যারাগুলোও সত্যিই সুসংগঠিত হয়ে উঠেছে।
পরবর্তী প্রায় নয় বছরে আমাদের সম্পর্ক পারিবারিক হয়ে যায়। অনেক সময় ল্যান্ডফোনে আমাকে না পেলে খসরু তার বৌদির কাছেই বিষয়টি জানিয়ে দিত।

সাংবাদিকতায় খসরুর পছন্দের দুটি ক্ষেত্রে আমাদের পথ এক হলেও মতের পার্থক্য ছিল। রাজনৈতিক অর্থনীতিতে আমীর খসরু রাষ্ট্রের পুঁজি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন। নিরাপত্তার প্রশ্নে, এমনকি কখনো কখনো রাজনীতিতেও, তিনি সামরিক শক্তিকে গুরুত্ব দিতেন। এ কারণেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান স্যারের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দুজনে মিলে একটি বইও লিখেছিলেন।
অন্যদিকে, পুঁজি সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল ভিন্ন। পুঁজি ও সম্পদ সঞ্চয়ের ইতিহাস রাষ্ট্রের ইতিহাসের চেয়ে অনেক প্রাচীন। মানুষ সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার বহু আগে থেকেই উৎপাদনের উপকরণ তৈরি করেছে, সম্পদ সঞ্চয় করেছে এবং নিজেদের মধ্যে বিনিময় করেছে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠিত করার ভূমিকা নিয়েছে। তাই পুঁজির অস্তিত্বকে কেবল রাষ্ট্রের সৃষ্টি বা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এদিক থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক শামসুল হুদা হারুন স্যার ছিলেন আমার পরামর্শ নেওয়ার অন্যতম জায়গা। তাঁর চিন্তার ধারায় চার্চিল ও রাসেলের মতো পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদদের পাশাপাশি বাংলার রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবও ছিল।
তালুকদার মনিরুজ্জামান ও শামসুল হুদা হারুন স্যারের চিন্তার এই দুটি ধারা এখন আর আগের মতো সংঘাতময় নেই। কারণ, প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে পুঁজির কার্যক্রমকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু আশি ও নব্বইয়ের দশকে তালুকদার মনিরুজ্জামান স্যারের চিন্তা এবং তাঁর সঙ্গে মতের মিল থাকা তরুণ আমীর খসরুদের ভাবনা রাজনীতি থেকে সাংবাদিকতা—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছিল। একইভাবে শামসুল হুদা হারুন স্যার ও তাঁর অনুসারীদের চিন্তাও সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
আমীর খসরু রাষ্ট্রীয় পুঁজিতে বিশ্বাসী হলেও তালুকদার মনিরুজ্জামান স্যারের চিন্তার প্রভাবে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। তিনি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন না; তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তবে জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল একটি ধারণা। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ডি. এল. রায়, নজরুল, এস. ওয়াজেদ আলী ও কাজী মোতাহার হোসেনের জাতীয়তাবাদী চিন্তার মধ্যে যেমন পার্থক্য ছিল, তেমনি সেই ভিন্নতার মধ্যেও ঐক্য ছিল। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আমীর খসরুদের মতো অনেকের সঙ্গে আমাদের আরেকটি গোষ্ঠীর সূক্ষ্ম পার্থক্য ও মতবিরোধের জায়গাটি ছিল জাতীয়তাবাদ।
জাতীয়তাবাদকে উদার ও অধিক গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও মতবিরোধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাংবাদিকতা, ইতিহাসচর্চা ও সাহিত্যচর্চায় এ ধরনের বিতর্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
এই চর্চা ও মতবিরোধ যে কতটা আনন্দের হতে পারে, তা বোঝার জন্য আমাদের সেই সময়ের কথা মনে করতে হয়। এখন সেই পরিবেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনো কোনো ঈদের এক বা দুই দিন পর খসরুর বাসায় গেলে বেলা গড়িয়ে রাত হয়ে যেত। খাবার থেকে চিন্তা—সবকিছুতেই আধুনিকতার ছাপ থাকত। মতের মিল হতো না, কিন্তু তাতে আড্ডা থেমে থাকত না। কখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেও ক্লান্ত রাতের আরও একটি প্রহর পার করে দিতাম।
এরপর আমীর খসরু বড় একটি রেডিও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হলে তাঁর কাজ বেড়ে যায়। আমার কাঁধেও এসে পড়ে জাতীয় একটি বড় দৈনিকের দায়িত্ব। সব মিলিয়ে আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ কমে যায়। তারপরও কোনো কোনো ঈদের তিন-চার দিন পর তাঁর বাসায় গিয়েছি।
এরপর মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হতো। একবার আমার একটি লেখা পড়ে সে ফোন করে বলেছিল, আমার সাম্প্রতিক লেখায় আগের লেখার সেই ধার খুঁজে পায়নি। তাই আপসকামী লেখা যেন তাকে আর না পাঠাই। আমি হেসে বলেছিলাম, হয়তো এটা বয়সের দোষ; রক্ত শীতল হয়ে যাচ্ছে।
তাঁর সঙ্গে সম্ভবত শেষবার কথা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে। তখন সম্ভবত আমি দিল্লিতে ছিলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটি বই লিখছেন। আমাকে বইটি ভালোভাবে পড়ে সেটি নিয়ে একটি লেখা লিখতে বলেছিলেন। এখানেও সেই উদার আমীর খসরুকে পেয়েছিলাম। তিনি বারবার বলেছিলেন, সমালোচনা করতে যেন কার্পণ্য না করি। লেখাটি যেন কোনো বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশ করি, সে কথাও বলেছিলেন। তিনি আমার নতুন অফিসের ঠিকানায় বইটি পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। আমি জানিয়েছিলাম, রকমারি থেকে বইটি কিনে নেব।
এরপর এবার দ্রুতই চলে আসে ৫ আগস্ট ২০২৪। কিন্তু বইটি আর কেনা হয়নি। কেন তাঁর সঙ্গে আর কথা হয়নি, তার সঠিক কৈফিয়তও দিতে পারব না।
১০ অক্টোবর ২০২৬-এর বিকেলে সাংবাদিক আমীর খসরুর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর ১১ অক্টোবর রাত দুইটার দিকে তাঁকে নিয়ে লিখতে বসি।
লিখতে বসার আগে দেখলাম, অনেকেই আমীর খসরুকে বিএনপির সমর্থক সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এ কারণেই তাঁর পুঁজিকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চিন্তা ও জাতীয়তাবাদী দর্শনের পাশাপাশি আমার নিজের অর্থনৈতিক চিন্তা নিয়েও কয়েকটি কথা উল্লেখ করলাম। এর কারণ, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত লেখক ও সাংবাদিকেরা নিজেদের চিন্তা ও দর্শনের ভিত্তিতে লেখালেখি ও সাংবাদিকতা করার চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো তাঁদের লেখা কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যেত, কারণ সেই দলগুলোও একই ধরনের চিন্তা করত। তবে তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা ওই রাজনৈতিক দলের হয়ে লিখতেন। একজন সাংবাদিক নিজের চিন্তা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকেই সাংবাদিকতা করেছেন—এটাই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আগেই উল্লেখ করেছি, পুঁজির প্রশ্নের বাইরে নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে অস্ত্রশক্তি বা সামরিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও তালুকদার মনিরুজ্জামান এবং তাঁর অনুসারী খসরুর চিন্তায় একটি মিশ্র অবস্থান ছিল। অন্যদিকে, শামসুল হুদা হারুন স্যারের অনুসারী হিসেবে আমরা কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও বেসামরিক শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতাম।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার গতিপথ বদলে গেছে। এখন একজন সফল সম্পাদকের সবচেয়ে বড় গর্ব অনেক সময় তাঁর নিজের কোনো প্রতিবেদন বা লেখা নয়; বরং তিনি একটি মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হয়ে সরকার উৎখাতে সফল হয়েছেন—এমন দাবিই তাঁর গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে।
এই সমাজ ও সময়ে আমীর খসরুর গায়ে বিএনপির তকমা লাগানো তাই অনেকের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। একইভাবে, তাঁর বিপরীত অর্থনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চিন্তায় বিশ্বাসীদের গায়েও আওয়ামী লীগের তকমা লাগানো হতে পারে।
দিনরাত রাস্তায় ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করে এবং বইয়ের পাতায় সময় দিয়ে একজন আমীর খসরু হয়ে উঠতে হয়। পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে অক্লান্ত পরিশ্রম প্রয়োজন, তার স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের আড়ালে তাঁর অর্জিত পেশাগত পরিচয়কে মুছে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। এ প্রবণতা নিন্দনীয়। একজন বড় রাজনীতিক যেমন নিজের পেশায় আলো ছড়ান, তেমনি প্রথম সারির একজন সাংবাদিকও তাঁর পেশাকে উজ্জ্বল করেন।
সমাজ নোংরা হয়ে গেছে। তাই এই সময়ে এ নিয়ে কিছু বলার নেই। তারপরও অন্তত একটি সত্য উচ্চারণ করলে আমীর খসরুকে সম্মান জানানো হবে: চিন্তা, পরিশ্রম ও পড়াশোনার সমন্বয়েই তিনি নিজের মতো করে একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক হয়ে উঠেছিলেন।
আমাদের নানা একাডেমিক বিতর্কে কখনো কখনো দুজনেরই কিছু কথা হয়তো সীমারেখা অতিক্রম করেছে। আজ সে সকল সীমার ওপারে আর নিস্তব্ধ রাতে সেই অনুজকে নিয়ে ভেজা চোখে কয়েকটি লাইন লিখছি, এক বিভক্ত ও নষ্ট সময়ে বসে—যে সময়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রায় নির্বাসিত।
অথচ আজও যদি তাঁকে ফোন করতে পারতাম, সব কথায় একমত না হলেও অন্তত ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যেত। এখন শুধু তাঁর সেলফোন নম্বরটিই রয়ে গেছে। ওপার থেকে ‘ব্রাদার, বলছি’—এ কথা বলার আমীর খসরু আর নেই।
স্বদেশ রায়, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও সম্পাদক সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
মূল্যস্ফীতির ধাক্কা: সবজিওয়ালার পুঁজি থেকে করপোরেট অর্থনীতি
বাংলাদেশ কি নাইজেরিয়ার পথে হাঁটছে
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি বন্ধে হামলার উপকারিতা
নারীমুক্তির রামমোহন, পূর্ববাংলার ব্রাহ্ম সমাজ ও রাহুল গান্ধী










