হিন্দু সমাজ এক সময়ে বদ্ধ জলাশয় হয়ে গিয়েছিল। রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উভয়েই ওই বন্ধ জলাশয়ে জন্ম নেওয়া কুসংস্কার নামক বৃষবৃক্ষ উৎখাত করেছিলেন।
মোটাদাগে রামমোহন রায় হিন্দু বিধবাকে স্বামীর সঙ্গে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার রীতি বন্ধ করেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবার বিবাহ চালু করেছিলেন। হিন্দু সমাজের এই দুই ভয়াবহ বৃষবৃক্ষ যে তাঁরা উৎখাত করেছিলেন, তা সকলেই জানেন। এর পরে এ দুজনের বড় কীর্তি, যা কোনো বিশেষ ধর্মের জন্য নয়, যেকোনো বাঙালির জন্য—তা শিক্ষা ও ভাষা নিয়ে কাজ।
রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কল্লোল যুগ, রাজশেখর বসু, সৈয়দ মুজতবা আলীর হাতের স্পর্শে সৃষ্ট যে ভাষায় আজ বাঙালি মাত্র সহজে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে, এর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন এই দুই মহীরুহ—রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

তবে তারপরেও রাজা রামমোহন যেমন ভারত পথিক, তিনি প্রথম এই উপমহাদেশে উদার রাষ্ট্রের চিন্তক। তেমনি তিনি আজকের আধুনিক নারীর নিজস্ব অবস্থান, নিজস্ব পরিচিতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী।
তার সৃষ্ট ব্রাহ্ম সমাজ নিয়ে হিন্দু সমাজে অনেক বিতর্ক আছে। বেশিরভাগ হিন্দু তাকে “বেম্ম” বলেই গালি দিয়েছিল। তারপরেও শেকড়ের খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, শুধু কলকাতায় নয়, পূর্ববাংলা, যা আজকের বাংলাদেশ—এখানে নারীশিক্ষার শুরু, পরিণত বয়সে নারীর বিয়ে এবং মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতার নিয়মের বেড়ির নামে অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে ঘরে বন্দী করে হিন্দু সমাজকে যে অতলে তলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার থেকে বের হয়ে আসার দরজাটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খুলে যায় মূলত রামমোহনের ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবে।
যে পরিবারগুলো ব্রাহ্ম হয়েছিল, তাদের নারীরা তো এগিয়ে ছিল এবং পরোক্ষভাবে তার প্রভাব পড়েছিল উঁচু তলার অনেক হিন্দু পরিবারে। এবং ব্রাহ্ম সমাজের মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী, বিজয় গোস্বামীর যুগে সে প্রভাব উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারে পড়ে। সেটা যতটা না ধর্মকে সংস্কার করেছিল, তার থেকে বড় কাজটি হয়েছিল নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে।
যার ফলে উচ্চশিক্ষিত ছেলেরা সাত থেকে দশ বছরের বর্ণপরিচয়হীন বালিকা বিয়ে করা থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে। যার হাত ধরে সমাজও বেরিয়ে আসে। এবং পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়েছিল বাঙালি মুসলিম সমাজেও।
এ ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ মোটেই পিছিয়ে ছিল না। দীননাথ সেনের ওপর লেখা তাঁর ছেলে আদিনাথের বই “দীননাথ সেন ও তৎকালীন পূর্ববঙ্গ” বইটির কথা উল্লেখ করেছেন মুনতাসীর মামুন তাঁর “উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম আন্দোলন” বইটিতে। এছাড়া ১৯৭১ সালে পুড়ে যাবার পরেও লেখকের নামবিহীন এবং প্রথমে ও শেষে কয়েক পৃষ্ঠা বিহীন “পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্ম সমাজ” নামে একটি ছোট বই আশির দশকের প্রথম দিকে ওই ব্রাহ্ম সমাজ লাইব্রেরিতে পড়েছি। ‘ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে ছোট আরেকটি বই ১৯৮৭ বা ১৯৮৮ সালে সন্ধানীতে ব্রাহ্ম সমাজের ওপর কভার স্টোরি করার জন্য মফিদুল ভাই (মফিদুল হক) আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন।
প্রথমে ২০১৭ সালে প্রকাশিত, পরে ২০২৬ সালে পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ, যা প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার রয়েল সাইজ বই “উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম আন্দোলন”—লেখক মুনতাসীর মামুন, প্রকাশক “অনন্যা”। বইটি ঐতিহাসিক। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন আমাকে দেন ২০২৫ সালের শেষের দিকে। অর্থাৎ লেখকের কাছে ছাপার প্রথম কয়েক কপি আসার পরে। তখনও বইটি বাজারে ছাড়া হয়নি।

এই বই নিয়ে লেখার পরিসর এটা নয়। তবে মুনতাসীর মামুনের এই বই পড়ার পরে ছোটবেলা থেকে যে সত্যটি দেখে এসেছি, তার প্রমাণ পেলাম তথ্যগতভাবে। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, বাঙালির যে পরিবারগুলো উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কারমুক্ত অনেক আগে থেকেই—তাদের পরিবারের সঙ্গে হয় ব্রাহ্মদের যোগ ছিল, না হয় পরিবারের কেউ না কেউ ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।
যেহেতু আমার মাতৃভূমি পূর্ববঙ্গ, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ। সত্তরের দশক থেকেই আমার ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের মূল কেন্দ্রে যাতায়াত। কিন্তু কীভাবে পূর্ববঙ্গে মাত্র কয়েকজন মানুষ এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা মুনতাসীর মামুনের ওই বইয়ের ভিত্তিতে আরেকদিন লেখার ইচ্ছে রইল।
তবে মুনতাসীর মামুনের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি এই বইয়ে দীর্ঘ দিনের একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের বন্ধুদের সঙ্গে বা কাজের সম্পর্কে পরিচয় হলে সব সময়ই একটি কথা বলি—দেখুন, পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশের বাঙালির সঙ্গে পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের মেলাবেন না। পূর্ববাংলার বা আজকের বাংলাদেশের নদীপাড়ের বাঙালি ভিন্ন। ভিন্ন যে, সেটা বুঝতে পারলেও কেন ভিন্ন—তার সঠিক কারণ পাইনি। মুনতাসীর মামুনের এই গবেষণা বইয়ের ১২৭ পৃষ্ঠায় শিবনাথ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতি বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে সকলেরই চোখ খুলে দিতে সাহায্য করবে। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজের বিস্তৃতি ঘটার কারণ সম্পর্কে শিবনাথ শাস্ত্রী লিখছেন, “পূর্ব বাংলার মানুষের লঘুচিত্ততা নাই। যাহা করিব, প্রাণ দিয়া করিব, যাহা ধরিব প্রাণ দিয়া ধরিব এই পূর্ব বাংলার ভাব। এ ভাব ভিন্ন দেশের অভ্যুত্থান ও জাতীয় জীবনের নববিকাশ হয় না।”
শিবনাথ শাস্ত্রীর পূর্ববাংলার, অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে উনিশ শতকের ওই উপলব্ধি থেকে বুঝতে পারি, কেন পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তান নামক অদ্ভুত রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পরেই দ্রুত প্রাণ দিয়ে বাংলাভাষাকে মাথায় নিয়ে দ্রুত বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অমন প্রাণের মাঝে আটকে ধরেছিল। এবং ‘যা করব, তা প্রাণ দিয়ে করব’—এই দৃঢ়চিত্ততা থেকেই তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু এগিয়ে নেয়নি, বাঙালির রাষ্ট্র তৈরি করে তাকে উন্নতও করেছিল।
বিদেশি চক্রান্ত ও তাদের দোসর ইউনূসের নেতৃত্বে মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে ধ্বংসের একটি পাঁয়তারা হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে অনেক, ঠিকই। কিন্তু দৃঢ়চিত্ত বাঙালি সিংহের মতো কোমর ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে গ্রামের একজন সাধারণ মা-বোন ইউনূসকে যে ভাষা প্রকাশ করে ঘৃণা করে, তা শুধু আগুন নয়, বারুদের গোলা। অন্যদিকে বাংলাদেশের শতকরা আশিভাগ মানুষ আবারও মনে প্রাণে আটকে ধরেছে বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে।
যা আবারও প্রমাণ করেছে, পূর্ব বাংলার মানুষের চরিত্রের সঙ্গে রামমোহনের সেই দৃঢ়তা। যিনি প্রথম ভারতবাসী ইংরেজকে বলেছিলেন, রাষ্ট্রে শাসক হিসেবে তুমি যে স্বাধীনতা ভোগ করবে, প্রতিটি নাগরিক সেই স্বাধীনতা ভোগ করবে। কারও বা কোনো গোষ্ঠীর স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার রাষ্ট্রের কোনো শাসকের থাকে না।
আর আজ রামমোহনের ১৯৩তম মৃত্যুদিনে আরেকটি বিষয় হিন্দু সমাজের সামনে এসেছে। তার মৃত্যুর ১৯২ বছর পরে ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী হিন্দু ধর্মীয় আচরণে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারীকে ঘিরে মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের যে তৃতীয় বিধানকে মান্য করা হয়, সেটিকে সংস্কার বা বাদ দেওয়ার জন্য বলেছেন।

মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ের তৃতীয় বিধানে বলা হয়েছে—
পিতা রক্ষতি কৌমরে ভর্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষণে স্থবিরে পুত্রা ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি।।
(স্ত্রীলোককে পিতা কুমারী জীবনে, স্বামী যৌবনে ও পুত্র বার্ধক্যে রক্ষা করে। স্ত্রীলোক স্বাধীনতার যোগ্য নয়।—অনুবাদ: সুরেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।)
মনুসংহিতার মতো এমন গ্রন্থগুলো সব সময়ই রাজা বা রাষ্ট্রের স্বার্থে কোনো না কোনো গোষ্ঠীকে বন্দী করার জন্য তৈরি হয়েছে। আর পৃথিবীতে নারীদের বন্দী করার জন্য এমন বিধানের বই বেশি। কারণ সিভিলাইজেশানের ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধ থেকে সংসার ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীরা বেশি নিবেদিত। তাই পুরুষ তার স্বার্থে বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে নারীকে বন্দী করার চেষ্টা করেছে বারবার।
হিন্দু সমাজের উচ্চবিত্তে, উচ্চ-মধ্যবিত্তে এই বন্দীত্ব নেই। তবে সাধারণ তলায় এই সব বিধান এখনও ভয় দেখায়। রাহুল গান্ধী বলেছেন, নারী শুধু কারও মাতা, স্ত্রী ও কন্যা নামে পরিচিত হবেন না; নারী রাষ্ট্র পরিচালক, উদ্যোক্তা, সমরবিদ—এমনকি নিজ নিজ যোগ্যতায় পরিচিত হবেন।
রামমোহনের মৃত্যুর ১৯২ বছর পরে চিন্তা ও আহ্বানের এ অগ্রগতি সত্যিই রামমোহনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। তবে বাঙালি মাত্র খুশি হতো, যদি কোনো বাঙালি বুক চিতিয়ে এ কথা বলতেন।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায়ের আরও লেখা
ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ায় লাভবান তারেক রহমান, ক্ষতি বাংলাদেশের
কিশোর গ্যাং, অপ্রতীমের মৃত্যু এবং “মবস্টার ইউনূস”
কানাঘুষোয় শোনা যায়, বিএনপি এসে গেছে
শোকের মাসের শেষ দিন: এবার বাঙালির বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন সাধারণের প্রাণে প্রাণে










