সুস্থ থাকতে নিয়মিত ব্যায়ামের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা, দীর্ঘ সময় অফিসে বসে থাকা, যানবাহনে যাতায়াত কিংবা ঘরে ফিরে ক্লান্তির কারণে অনেকের পক্ষেই প্রতিদিন ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ সুস্থ থাকার জন্য সব সময় জিমে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা করা জরুরি নয়। জীবনের ছোট ছোট নড়াচড়া ও সাধারণ কাজের মাধ্যমেও দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পিত ব্যায়ামের বাইরেও দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীর সচল রাখার অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে ক্যালরি খরচ বাড়তে পারে, হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা মিলতে পারে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমার সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় চেয়ারে বসে থাকা, গাড়িতে যাতায়াত এবং অবসরে সোফায় বসে থাকার অভ্যাস অনেকের জীবনের অংশ। এভাবে দিনের বড় একটি সময় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কাটে। বিভিন্ন গবেষণায় দীর্ঘ সময় বসে থাকার সঙ্গে হৃদ্রোগসহ নানা গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই একটানা বসে থাকার সময় কমানো এবং দিনের মধ্যে বারবার শরীর নড়াচড়া করানো গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যায়াম ছাড়াও শরীর সচল রাখার উপায়
পরিকল্পিত ব্যায়ামের বাইরে দৈনন্দিন চলাফেরা ও শারীরিক পরিশ্রমকে বলা হয় অনিয়মিত বা দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা। বিজ্ঞানের ভাষায় এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা হলো ‘নন-এক্সারসাইজ অ্যাকটিভিটি থার্মোজেনেসিস’ বা এনইএটি। ঘুমানো, খাওয়া কিংবা নির্ধারিত ব্যায়ামের বাইরে শরীরের বিভিন্ন নড়াচড়ায় যে শক্তি খরচ হয়, তা এই ধারণার অন্তর্ভুক্ত।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক অনন্ত নারায়ণনের মতে, বসে থাকার সময় পা নাড়ানো, শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তন করা, কাঁধ ঘোরানো কিংবা পায়ের পেশি সংকুচিত করার মতো ছোট কাজও এর অংশ। এ ধরনের নড়াচড়া সামান্য মনে হলেও দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার তুলনায় পেশির কার্যক্রম বাড়াতে পারে। ফলে দিনের মোট শক্তি খরচ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বসে থেকেও পা নাড়ানোর উপকার
ছোটবেলা থেকেই অনেককে স্থির হয়ে বসতে শেখানো হয়। বারবার হাত-পা নাড়ানোকে অনেক সময় অমনোযোগিতা বা অস্থিরতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্ষেত্রে পা নাড়ানোর মতো অভ্যাসের কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকার রয়েছে।
দীর্ঘ সময় বসে থাকলে পায়ের পেশি তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে। এতে পেশির নিয়মিত সংকোচন কমে যায়, যা রক্তপ্রবাহ এবং রক্ত থেকে গ্লুকোজ ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। পা নাড়ালে পেশির কার্যক্রম বাড়ে এবং স্থির হয়ে বসে থাকার তুলনায় কিছুটা বেশি ক্যালরি খরচ হতে পারে।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় পা নাড়ানোর সঙ্গে বাড়তি শক্তি খরচের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আগের কিছু গবেষণায়ও দেখা গেছে, অভ্যাসগতভাবে পা নাড়ানো রক্তনালির কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এসব সম্ভাব্য উপকারের বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ছোট পরিসরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পা ঝাঁকানোর অভ্যাসে স্থির হয়ে বসে থাকার তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি শক্তি খরচ হতে পারে। তবে এই ফলাফল থেকে পা নাড়ানোকে পূর্ণাঙ্গ ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
ঘরের কাজও হতে পারে শরীরচর্চার অংশ
শরীর সচল রাখতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, ঝাড়ু দেওয়া, বাগানের পরিচর্যা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলার মতো কাজও বসে থাকার সময় কমাতে পারে।
২০২৪ সালের একটি বড় গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ২২ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের শরীরে এমন যন্ত্র পরানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে দিনের বিভিন্ন সময়ে তাঁদের চলাফেরার পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। তাঁরা নিয়মিত পরিকল্পিত ব্যায়াম করতেন না।
আট বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা দেখতে পান, বেশি দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা দীর্ঘ সময় বসে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় প্রতিদিন এক মিনিটের কম স্থায়ী ছোট ছোট সক্রিয়তার পর্ব মিলিয়ে প্রায় চার মিনিটের কার্যক্রমের সম্ভাব্য উপকারের কথাও উঠে আসে। পরবর্তী গবেষণায় দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তার সঙ্গে অকালমৃত্যুর কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এসব গবেষণার ফলাফলকে নিশ্চিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা, রোগের ইতিহাস এবং সক্রিয়তার ধরন অনুযায়ী উপকারের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলাস কোয়েমেলের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, বাজারের ভারী ব্যাগ বহন করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলার মতো কাজকে দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কাজে যাওয়ার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা দ্রুত হাঁটা, কেনাকাটার সময় দোকান থেকে একটু দূরে গাড়ি রাখা কিংবা ট্রলির বদলে ঝুড়ি ব্যবহার করেও শরীরের নড়াচড়া বাড়ানো যায়। কেনাকাটার সময় কয়েক কেজি পণ্য হাতে বহন করলে পেশিরও কিছুটা কাজ হয়।
পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে নতুন নড়াচড়া যোগ করুন
নিয়মিত ব্যায়ামের বড় লক্ষ্য অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। তাই আগে থেকেই জীবনে থাকা অভ্যাসের সঙ্গে ছোট ছোট শারীরিক কার্যক্রম যুক্ত করা কার্যকর কৌশল হতে পারে। যুক্তরাজ্যের লাফবরো ইউনিভার্সিটির আচরণগত চিকিৎসাবিষয়ক অধ্যাপক আমান্ডা ড্যালির মতে, পরিচিত কাজের সঙ্গে নড়াচড়া যুক্ত করলে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা সহজ হতে পারে।
যেমন দাঁত ব্রাশ করার সময় গোড়ালি উঁচু করে দাঁড়ানো, ডেস্কে বসে পা তোলা কিংবা ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটাহাঁটি করা যায়। অনলাইনে কেনাকাটা করা পণ্য বাড়িতে পৌঁছে নেওয়ার বদলে কাছের সংগ্রহকেন্দ্র থেকে আনতে গেলেও হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়।
কর্মক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি গবেষণায় চিকিৎসকদের দাঁড়িয়ে কাজ করার উপযোগী ডেস্ক দেওয়া হয়েছিল। এতে তাঁদের প্রতিদিন বসে থাকার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমেছিল। পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্ষতি ও শারীরিক সক্রিয়তার উপকারিতা নিয়ে আলোচনার সুযোগও বেড়েছিল।
এ ধরনের অভ্যাসের আরেকটি সুবিধা হলো, নিয়মিত করতে থাকলে তা জীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠতে পারে। শুরুতে ছোট মনে হলেও অভ্যাসটি ধরে রাখতে পারলে দিনের মোট সক্রিয়তা বাড়তে পারে।
কীভাবে শুরু করবেন
শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কাজের ফাঁকে নিয়মিত উঠে দাঁড়ানো, কিছুক্ষণ হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটাহাঁটি করা এবং ঘরের ছোটখাটো কাজ নিজে করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
দীর্ঘ সময় বৈঠকে বসে থাকলে সুযোগ বুঝে পায়ের পেশি নড়ানো বা শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তন করা যায়। কর্মক্ষেত্রে সম্ভব হলে কিছু কাজ দাঁড়িয়ে করা যেতে পারে। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নড়াচড়ার ধরন বেছে নেওয়া জরুরি।
মূল কথা হলো, শরীরকে দীর্ঘ সময় একটানা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় না রাখা। অল্প অল্প করে বারবার নড়াচড়া করার অভ্যাস দিনের মোট সক্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে এসব কাজ নিয়মিত ও পরিকল্পিত ব্যায়ামের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। সুস্থ থাকতে সম্ভব হলে হাঁটা, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং অন্যান্য উপযোগী শরীরচর্চাও চালিয়ে যেতে হবে।












