ঢাকায় জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মৌসুমি ফ্লুর পাশাপাশি ডেঙ্গু, হাম ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। এসব রোগের উপসর্গে মিল থাকায় শুধু জ্বর বা শরীরব্যথা দেখে সংক্রমণের ধরন বোঝা কঠিন। তাই জ্বর হলেই সেটিকে সাধারণ ফ্লু ধরে নেওয়া কিংবা নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন স্বাস্থ্যতথ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে জ্বর, মৌসুমি ফ্লু ও অন্যান্য সংক্রমণের রোগী নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। শিশুদের চিকিৎসায় শয্যা ও নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ডেঙ্গু ও হামেও জ্বর দেখা দিতে পারে বলে শুধু উপসর্গ দেখে রোগ শনাক্ত করা কঠিন। তবে সেপ্টেম্বরের তথ্য দিয়ে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সংক্রমণের বর্তমান প্রবণতা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
গরম ও বর্ষাতেও বাড়তে পারে ফ্লু
বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা মৌসুমি ফ্লু শুধু শীতকালের রোগ নয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) নজরদারির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফ্লুর সংক্রমণ সাধারণত এপ্রিল থেকে বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরের দিকে কমতে থাকে। জুন, জুলাই ও আগস্টে শনাক্তের হার বেশি থাকতে পারে।
আইইডিসিআর ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) সরকারি হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ করে। ২০২৬ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত নমুনায় ফ্লু শনাক্তের হার জানুয়ারিতে ২ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে ৩ শতাংশ এবং মার্চে ৪ শতাংশ ছিল। এপ্রিল থেকে তা বেড়ে জুলাইয়ে ৬৭ শতাংশ ও আগস্টে ৬২ শতাংশে পৌঁছায়। সেপ্টেম্বরে হার কমে ১৬ শতাংশে নেমে আসে।
এই পরিসংখ্যান পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ফ্লু শনাক্ত হওয়ার হার নির্দেশ করে; দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আক্রান্তের হার নয়। সেপ্টেম্বরের পর সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি বুঝতে আরও হালনাগাদ নজরদারির তথ্য প্রয়োজন।
সব জ্বরই ফ্লু নয়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ছয় লাখ ৩৫ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হন। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ ৯৫ হাজার রোগী জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে এই সংখ্যা শুধু ফ্লুতে আক্রান্ত রোগীর নয়; এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জ্বর ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীরাও রয়েছেন।
মৌসুমি ফ্লুতে সাধারণত জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। ডেঙ্গুতেও জ্বর, শরীরব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়। হামের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে পরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তাই উপসর্গের মিল থাকলেও রোগগুলো এক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত করা কঠিন।
মৌসুমি ফ্লু ও বার্ড ফ্লু আলাদা
ফ্লু নিয়ে আলোচনায় মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা ও বার্ড ফ্লুর পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে পরীক্ষিত নমুনার চারটিতে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর এইচ৫এন১ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংক্রমণের সঙ্গে পোলট্রি খামার বা জীবন্ত পাখির বাজারে সংস্পর্শের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
তবে এই তথ্যকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বার্ড ফ্লু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সংক্রমণের উৎস, বিস্তার ও ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা পেতে পরীক্ষাগারভিত্তিক শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
জ্বর হলে কী করবেন
জ্বর, সর্দি বা কাশি দেখা দিলে বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল পান করা এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো জরুরি। অসুস্থ অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং ভিড় এড়িয়ে চলা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক অবসন্নতা, পানি পান করতে না পারা বা শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসা নিতে হবে। জ্বর হলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। ডেঙ্গুর সম্ভাবনা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো জরুরি।
ঢাকায় জ্বর-সর্দি দেখা দিলে সব উপসর্গকে একই ভাইরাসের সংক্রমণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। মৌসুমি ফ্লু, ডেঙ্গু, হাম ও অন্যান্য সংক্রমণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে যথাযথ চিকিৎসা-পরামর্শ ও পরীক্ষা প্রয়োজন। আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা নেওয়া এবং হালনাগাদ স্বাস্থ্যতথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।












