জি-কে সেচ প্রকল্প বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি বড় সেচ ব্যবস্থা (Ganges-Kobadak Irrigation Project)। এটি পদ্মা নদীর পানি পাম্পে তুলে খালের মাধ্যমে ফসলের জমিতে পৌঁছে দেয়। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার কৃষকেরা এর ওপর ভরসা করেন।
জি-কে নামটি এসেছে ইংরেজি Ganges-Kobadak থেকে, অর্থাৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ। এই লেখায় সহজ ভাষায় জানা যাবে প্রকল্পটি কী, কোথায় আছে আর কীভাবে চলে।
এক নজরে
- পুরো নাম: গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, সংক্ষেপে জি-কে।
- পানির উৎস: পদ্মা নদী।
- জেলা: কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা।
- প্রকল্প এলাকা: প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর।
- পদ্ধতি: পাম্পে পানি তুলে খালের মাধ্যমে বিলি।
- পরিকল্পনার শুরু: ১৯৫০-এর দশকে, পাকিস্তান আমলে।
- দেখভাল করে: পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জি-কে সেচ প্রকল্প কী
সেচ মানে শুকনো সময়ে কৃত্রিম উপায়ে জমিতে পানি দেওয়া। বৃষ্টি কম হলে ফসল বাঁচাতে এটি দরকার হয়। জি-কে সেচ প্রকল্প এই কাজটিই বড় আকারে করে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। সঙ্গে ছিল ফসলের ধরন ও চাষের মাত্রা ভালো করা এবং কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ আর পানি নিষ্কাশন ছিল তুলনামূলক ছোট উদ্দেশ্য।
দেশের বড় সেচ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত। প্রকল্পের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চলে।
জি-কে সেচ প্রকল্প কোথায় অবস্থিত
প্রকল্পটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে। এর আওতায় আছে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলা। চারটি জেলাতেই ধান ও অন্যান্য ফসলের চাষ হয়।
পুরো প্রকল্প এলাকা প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। এক হেক্টর মানে প্রায় আড়াই একর। তবে এই পুরো জমিতে একসঙ্গে সব সময় সেচ হয় না, কারণ সেচের মাত্রা বছর ও মৌসুম অনুযায়ী বদলায়।
জি-কে প্রকল্প কীভাবে কাজ করে
প্রকল্পের পুরো ব্যবস্থা পদ্মা নদীর পানির ওপর নির্ভর করে। নদী থেকে একটি খাল কেটে পানি পাম্প ঘরে আনা হয়। সেখানে বড় পাম্প দিয়ে পানি ওপরে তোলা হয়।
এরপর পানি মূল খাল ধরে এগিয়ে যায়। মূল খাল থেকে পানি শাখা খালে যায়, তারপর আরও ছোট নালায় ভাগ হয়ে মাঠে পৌঁছায়। ঢালের সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই বিলি চলে, তাই প্রতিটি মাঠের জন্য আলাদা পাম্প লাগে না।
ফলে একটি মূল পাম্প ঘরের পানি অনেক দূরের গ্রাম পর্যন্ত যেতে পারে। কৃষককে নিজের খরচে গভীর নলকূপ বসাতে হয় না। এটাই এই ধরনের প্রকল্পের বড় সুবিধা।
খাল, পাম্প আর নলকূপ: সেচের তিন পথের পার্থক্য কী
বাংলাদেশে সেচের পানি মোটামুটি দুই জায়গা থেকে আসে। একটি হলো নদী, খাল ও বিলের ওপরের পানি। অন্যটি মাটির নিচের পানি, যাকে ভূগর্ভের পানি বলা হয়।
নলকূপ বসিয়ে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা হলে খরচ পড়ে কৃষকের নিজের ঘাড়ে। জমি ছোট হলে একটি নলকূপ কয়েকজন কৃষক ভাগ করে চালান। আর জি-কে প্রকল্পের মতো ব্যবস্থায় নদীর পানি সরকারি খালপথে আসে, তাই একসঙ্গে অনেক জমি সেচের আওতায় আসে।
দুই ব্যবস্থারই সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা আছে। নদীর পানির ব্যবস্থা নির্ভর করে নদীতে পানি থাকার ওপর। নলকূপের ব্যবস্থা নির্ভর করে মাটির নিচে পানি কতটা আছে তার ওপর। তাই কৃষি এলাকায় দুটি উৎসই একসঙ্গে কাজে লাগে।
বোরো মৌসুমে সেচ কেন এত জরুরি
বোরো ধান চাষ হয় শীতের শেষ থেকে বসন্ত পর্যন্ত, যখন বৃষ্টি খুব কম হয়। এই সময়ে জমিতে পানি ধরে রাখতে হয়, না হলে ধানের চারা বাড়ে না। তাই বোরো প্রায় পুরোপুরি সেচের ওপর নির্ভরশীল।
প্রকল্প এলাকার কৃষকেরা এই সময়ে জি-কে প্রকল্পের খালের পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন। খালে পানি সময়মতো না এলে চারা রোপণ পিছিয়ে যায়। দেরিতে রোপণ হলে ফলনও কমে যেতে পারে।
জি-কে প্রকল্প কবে শুরু হয়েছিল
প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে, তখন এই অঞ্চল পাকিস্তানের অংশ ছিল। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৫১ সালে প্রাথমিক জরিপ হয় এবং ১৯৫৪ সালে সরকার প্রকল্প অনুমোদন করে।
তখনকার সময়ে এই অঞ্চলের অনেক জমি বছরের বড় অংশ সেচের অভাবে পড়ে থাকত। নদীর পানি তুলে সেই জমিকে চাষের আওতায় আনাই ছিল মূল ভাবনা।
পদ্মার পানি কমলে প্রকল্পে কী সমস্যা হয়
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পদ্মার ওপর পুরো নির্ভরতা। শুকনো মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে খালের মুখে পানি পৌঁছায় না। তখন পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রকল্প এলাকার কৃষকদের বিকল্প সেচের উৎস সীমিত। তাই পানির ঘাটতি হলে সরাসরি ফসলের ক্ষতি হয়। এ কারণেই পদ্মার পানির স্তর আর পাম্পের সক্ষমতা নিয়ে প্রকল্প এলাকায় বারবার আলোচনা ওঠে।
এই সমস্যা আর পাম্পিং ব্যবস্থা নিয়ে আরও জানতে পড়তে পারেন পদ্মার পানি কমলেও সেচ সচল রাখতে পাম্পিং ব্যবস্থার বড় পরিবর্তন আনছে জিকে প্রকল্প।
বাংলাদেশের কৃষি ও নদীর জন্য জি-কে সেচ প্রকল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে ধানের বড় অংশ আসে সেচনির্ভর বোরো মৌসুম থেকে। যেসব এলাকায় ভূগর্ভের পানি কমে যাচ্ছে বা সেচের খরচ বেশি, সেখানে নদীর পানিতে চলা বড় প্রকল্প কৃষককে ভরসা দেয়। জি-কে প্রকল্প সেই কাজ দক্ষিণ-পশ্চিমের চারটি জেলায় করে আসছে।
বড় সেচ প্রকল্প নদীর ওপরও প্রভাব ফেলে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী জি-কে প্রকল্প চালুর পর কুমার নদ নবগঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন সেটি মূলত প্রকল্পের বাড়তি পানি আর স্থানীয় বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে।
অর্থাৎ সেচ ব্যবস্থা কৃষির জন্য আশীর্বাদ হলেও আশপাশের নদীর প্রবাহ বদলে দিতে পারে। তাই এ ধরনের প্রকল্পে ফসল আর নদী, দুটির কথাই একসঙ্গে ভাবতে হয়। নদীর নামে নদ আর নদীর ভেদ নিয়ে জানতে পড়তে পারেন নদ ও নদীর পার্থক্য কী।
সাধারণ প্রশ্ন
জি-কে সেচ প্রকল্পের পূর্ণরূপ কী?
জি-কে মানে গঙ্গা-কপোতাক্ষ, ইংরেজিতে Ganges-Kobadak। পুরো নাম গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প।
জি-কে সেচ প্রকল্প কোন কোন জেলায়?
কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলায়। চারটি জেলার কৃষকেরা এর পানি ব্যবহার করেন।
জি-কে প্রকল্প কোন নদীর পানি ব্যবহার করে?
প্রকল্পটি পদ্মা নদীর পানি ব্যবহার করে। সেই পানি পাম্পে তুলে খালের মাধ্যমে মাঠে দেওয়া হয়।
জি-কে সেচ প্রকল্প কত বড়?
প্রকল্প এলাকা প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। দেশের বড় সেচ প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬












