ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটাকে ‘পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস’ করার অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে ভারতের শিল্প খাতের স্বাধীনতা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে টাটা গোষ্ঠীকে ঘিরে চলমান বিরোধে মোদি সরকারের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল বলেন, টাটাকে ধ্বংস করা হচ্ছে, অথচ কোনো ব্যবসায়ী নেতা এ নিয়ে কথা বলার সাহস দেখাচ্ছেন না। তাঁর প্রশ্ন, ব্যবসায়ীরা কত দিন নীরব থাকবেন—যত দিন না তাঁদের নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়?
তিনি আরও বলেন, ভারতের ব্যবসা খাত নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এসব ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কংগ্রেস লড়াই চালিয়ে যাবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
টাটা সন্সের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ
টাটা গোষ্ঠীকে ঘিরে এই রাজনৈতিক বিতর্কের পেছনে রয়েছে টাটা সন্সের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ। টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসেবে এন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ওই পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার নির্দেশনার পর টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। এসব বিরোধে টাটা ট্রাস্টসের ট্রাস্টিদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টাটা সন্স ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠীটির মূল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। এর অধীনেই রয়েছে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস বা টিসিএসের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। ফলে নেতৃত্ব ও মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধটি শুধু একটি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং ভারতের বৃহৎ করপোরেট খাতের শাসনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
টিসিএস ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে আগের প্রশ্ন
এর আগে নির্বাচন কমিশনের জন্য ইসিনেট ব্যবস্থা তৈরিতে টিসিএসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন রাহুল গান্ধী। নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬-এ কথিত ‘অবৈধ’ পরিবর্তন আনতে কোম্পানিটিকে কে নির্দেশ দিয়েছিল, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এ কাজে টিসিএসের কর্মকর্তাদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা-ও জানতে চান কংগ্রেস নেতা।
কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল, ইসিনেট পরিচালনার দায়িত্বে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখায়নি। টিসিএসের সম্পৃক্ততার বিষয়টি কোম্পানির নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে সামনে এসেছে বলেও দলটি দাবি করে।
এই প্রসঙ্গ টেনে কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছিল, টাটা সন্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বিরোধের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় টিসিএসের ভূমিকার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না। তবে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রের কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কংগ্রেস নেতাদের সমর্থন
রাহুলের সর্বশেষ বক্তব্যের পর কংগ্রেসের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা ও রাজ্য শাখা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা প্রশ্ন তুলেছেন, স্বাধীনতার আগের সময় থেকে বহু প্রজন্মের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা টাটা ব্র্যান্ডকে দুর্বল করা কি শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি? নাকি প্রতিযোগীদের সরিয়ে দেওয়ার কৌশল?
জ্যেষ্ঠ সাংসদ কুমারী শৈলজা বলেছেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চাপ বা ভয়ভীতির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করা উচিত নয়। তাঁর মতে, আজকের নীরবতা ভবিষ্যতে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে পারে।
কংগ্রেসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মবিষয়ক প্রধান সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অভিযোগ করেছেন, ভারতে একাধিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, একচেটিয়া ব্যবসার প্রবণতা বেড়েছে এবং কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য নীতিনির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর সতর্কবার্তা, কয়েক দশকে গড়ে ওঠা টাটার মতো ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে যা ঘটছে, তা অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।
উত্তর প্রদেশ, গোয়া ও হিমাচল প্রদেশের কংগ্রেস নেতারাও একই সুরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং করপোরেট নেতৃত্বের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে টাটা গোষ্ঠীকে ঘিরে বিরোধের প্রকৃত কারণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং সম্ভাব্য একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এখনো বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। ফলে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে; এর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ব্যাখ্যা ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।












