যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। তবে দেশটির অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন। বিশেষ করে এআই-নির্ভর তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমান নির্বাচনী প্রচারে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের প্রার্থীরাও বিষয়টি সামনে আনছেন। তবে বাস্তবে কোথায় তথ্যকেন্দ্র তৈরি হবে, কতটা বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে উঠবে এবং নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হবে কি না—এসব বিষয়ে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রভাব অনেক বেশি।
এআই বিনিয়োগে নির্ভর করছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার নয়, বরং কয়েক শ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। ২০২৭ সালে এই বিনিয়োগের পরিমাণ এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
বিনিয়োগ ব্যাংক জেপিমরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এসেছে এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ থেকে। ING-এর বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রায় এক-তৃতীয়াংশে অবদান রাখতে পারে এআই খাত।
এ কারণে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে রাজনৈতিক বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু প্রযুক্তি শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মাণ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, যন্ত্রপাতি উৎপাদন এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনেক অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটও শুরু হয়েছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের সাফল্যের প্রত্যাশা শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কিছু বিশ্লেষক। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এআই খাতের উত্থান থেমে যাওয়ার আশঙ্কায় বাজারে অস্থিরতাও দেখা গেছে।
ম্যাকোয়ারির বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা ও সুদের হারবিষয়ক কৌশলবিদ থিয়েরি উইজম্যানের মতে, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় নির্বাচনে তথ্যকেন্দ্রবিরোধী প্রার্থীরা জয়ী হলে শেয়ারবাজারে আরও দরপতন হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলো কি না, তার চেয়ে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে কারা ক্ষমতায় আসছেন এবং তাঁরা কী ধরনের নীতি গ্রহণ করছেন, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভার্জিনিয়ায় অ্যামাজনের প্রকল্প বাতিল
স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে ভার্জিনিয়ার লাউডাউন কাউন্টিতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যাপক বিরোধিতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার পর অ্যামাজন সেখানে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করেছে।
প্রকল্পটির জন্য অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলারে জমি কিনেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এলাকায় তথ্যকেন্দ্রের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। জমি কেনার বিষয়টি কাউন্টি নেতাদের অনেককে বিস্মিত করেছিল বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, অ্যামাজন ওই জমিতে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করবে না। জমির বেশির ভাগ অংশ আবাসিক ও মিশ্র ব্যবহারের উন্নয়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি একটি কমিউনিটি শিল্পকলা কেন্দ্র ও বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২৫ একর জমি দেওয়া হবে। স্থানীয় আবাসন তহবিলেও প্রতিষ্ঠানটি ৫০ লাখ ডলার অনুদান দেবে।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও স্থানীয় জনগণের আপত্তি ও জনপ্রতিনিধিদের অবস্থান প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
টেক্সাসেও বদলাচ্ছে রাজনৈতিক অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রে এআই শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র টেক্সাস। সেখানে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট আগে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু পুনর্নির্বাচনের কঠিন লড়াইয়ের মুখে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি জিনা হিনোজোসার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন অ্যাবট। নির্বাচনী চাপের মধ্যে তথ্যকেন্দ্র নিয়ে তাঁর আগের সমর্থন কিছুটা সংশয়পূর্ণ অবস্থানে রূপ নিয়েছে।
এটি দেখায়, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ এখন শুধু প্রযুক্তি ও অর্থনীতির বিষয় নয়; স্থানীয় ভোটারদের মনোভাবও রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল পিয়ার্সও মনে করেন, ওয়াশিংটনের কংগ্রেস নির্বাচনের তুলনায় অঙ্গরাজ্যের রাজধানী ও স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচনের ফল তথ্যকেন্দ্র সম্প্রসারণের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে বিভিন্ন বিধিবিধান ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেসে এ বিষয়ে বড় ধরনের সমন্বিত আইন পাস করতে সময় লাগতে পারে। বিপরীতে, স্থানীয় প্রশাসন নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশগত পর্যালোচনা এবং বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযোগের জটিলতার মাধ্যমে দ্রুত বাধা তৈরি করতে পারে।
টেক্সাস থেকে মধ্যপশ্চিম—নজরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য
পিয়ার্সের মতে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তথ্যকেন্দ্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে টেক্সাস ও ক্যারোলাইনা অঞ্চলের পাশাপাশি মধ্যপশ্চিমের ওহাইও, ইলিনয় ও উইসকনসিনের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এসব রাজ্যে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে বা বিপক্ষে থাকা প্রার্থীদের জয়-পরাজয় প্রযুক্তি বিনিয়োগের পরিবেশ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে পারে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও।
পিয়ার্সের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে তথ্যকেন্দ্রবিরোধী অবস্থান যদি রাজনৈতিকভাবে লাভজনক প্রমাণিত হয়, তাহলে ২০২৮ সালের নির্বাচনী প্রচারেও তথ্যকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতা কমাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন কৌশল নিতে পারে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের ফলে স্থানীয় করের বোঝা কমবে, স্কুলের জন্য অর্থ পাওয়া যাবে কিংবা সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হবে—এমন সুবিধা দেখাতে পারলে প্রকল্পের পক্ষে জনসমর্থন বাড়তে পারে।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল বলেও পিয়ার্স উল্লেখ করেছেন। তাঁর ধারণা, সামনে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও প্রতিকূল হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেও কিছু প্রতিষ্ঠান দ্রুত নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
নিষেধাজ্ঞা এলেও অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে সময় লাগবে
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দিতে সক্ষম হলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে ধীর হয়ে যাবে, এমন নয়।
পিয়ার্সের হিসাব অনুযায়ী, তথ্যকেন্দ্রের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির বড় অংশ আসে এর ভেতরে ব্যবহৃত কম্পিউটিং যন্ত্রপাতি থেকে। নির্মাণকাজের তুলনায় এসব যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ সাধারণত ছয় থেকে আট প্রান্তিক বা প্রায় দেড় থেকে দুই বছর পিছিয়ে আসে।
অর্থাৎ, চলতি বছরে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে যে বিনিয়োগের ঢেউ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব আগামী কয়েক বছর ব্যবসায়িক বিনিয়োগে অবদান রাখতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন কমে গেলেও ইতিমধ্যে শুরু হওয়া প্রকল্প ও পরবর্তী সময়ে যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয় অর্থনীতিকে কিছুটা সময় ধরে সহায়তা করবে।
তাই নির্বাচনের পর তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বাধা তৈরি হলেও তার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা নাও যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নতুন প্রকল্প কমে গেলে বিনিয়োগের গতি কমার আশঙ্কা থাকবে।
এআই খাতের জন্য ধীরগতিও হতে পারে ইতিবাচক
অন্যদিকে, এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কিছুটা কমে আসা সব দিক থেকে নেতিবাচক নাও হতে পারে। মর্গ্যান স্ট্যানলি ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক ড্যানিয়েল স্কেলির মতে, সাম্প্রতিক শেয়ারবাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও এআই খাতের প্রবৃদ্ধি ও আয় পরিস্থিতি এখনও শক্তিশালী। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগচক্রও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, বিদ্যুতের ঘাটতি, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে দক্ষ কর্মীর সংকট এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা—এসব কারণে বিনিয়োগচক্র দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে অস্বাভাবিক দ্রুত উত্থানের পর এআই খাতে বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকিও কমতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণ করবে না। স্থানীয় পর্যায়ে কারা নির্বাচিত হচ্ছেন, তাঁরা তথ্যকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নিয়ে কী নীতি নিচ্ছেন এবং জনগণের উদ্বেগ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—এসব বিষয়ও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












