ইন্দোনেশিয়ার সরকারি গুদামগুলোতে চালের মজুত রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অথচ দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো, এখনো চড়া দামে চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। সরকারের গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য থাকা সত্ত্বেও বাজারে তার সুফল না পৌঁছানো একটি মৌলিক নীতিগত ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু কত টন চাল মজুত আছে, তার হিসাব নয়; মানুষের নিয়মিত ও সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার কেনার সামর্থ্য নিশ্চিত করাই এর আসল পরীক্ষা।
চলতি প্রান্তিকে ইন্দোনেশিয়ার ৪ কোটি নয়, বরং ৩ কোটি ৩২ লাখ নাগরিককে একবারে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তাঁরা দেশের সর্বনিম্ন আয়ের চারটি দশমাংশের অন্তর্ভুক্ত। খাদ্যমন্ত্রী জুলকিফলি হাসান এই উদ্যোগকে ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু সরকারি চালের মজুত ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করলে অন্য একটি বাস্তবতাও সামনে আসে: পুরোনো চালের মান আরও নষ্ট হওয়ার আগেই গুদাম খালি করার প্রয়োজন এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি গুদাম থেকে একসঙ্গে ১০ লাখ টন চাল বের করার পরিকল্পনা তাই শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানোর কর্মসূচি নয়; এটি অতিরিক্ত মজুত সামলানোরও একটি উপায়।
গুদামভর্তি চাল, তবু বাজারে বেশি দাম

ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চালের মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টনে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে এই পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১০ হাজার টন। চলতি বছরের শুরুর দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত লজিস্টিক সংস্থা বুলোগের মজুত একপর্যায়ে ৫৪ লাখ টনে পৌঁছেছিল।
সরকার কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ধান কিনে এই মজুত গড়ে তুলেছে। প্রায় ৪১ লাখ টন চালের সমপরিমাণ ধান সংগ্রহ করা হয়েছে প্রতি কেজি ৬ হাজার ৫০০ রুপিয়াহ ন্যূনতম দামে, ধানের মান যেমনই হোক। কিন্তু সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা এত বিপুল শস্য রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে বেসরকারি গুদাম ভাড়া করতে হয়েছে।
এর মধ্যেও বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অক্টোবরের মাঝামাঝি ইন্দোনেশিয়ায় মাঝারি মানের চালের গড় খুচরা দাম ছিল প্রতি কেজি প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ রুপিয়াহ। অথচ সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৩ হাজার ৫০০ রুপিয়াহ। অর্থাৎ বাজারদর নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।
এই বৈপরীত্যই দেখায়, সরকারি মজুতের পরিমাণ বাড়লেই খাদ্য সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসে না।
কৃষকের আয় বাড়ানোর টেকসই পথ উৎপাদনশীলতা
কৃষি অর্থনীতিবিদ জন মেলরের গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে: কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি আয় বৃদ্ধির জন্য শুধু ফসলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি, উন্নত বীজ ও কৃষি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ জরুরি। ফলন বাড়লে কৃষকের আয় বাড়ে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং কৃষির বাইরের খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।
ইন্দোনেশিয়া বরং সরকারি ক্রয় ও মূল্য সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে। সরকার কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে ধান কিনে তাঁদের আয় সুরক্ষার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার ব্যয় কম নয়। ধান কেনা, গুদামে রাখা এবং পরে তা বিতরণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেই অর্থ সেচব্যবস্থা, গ্রামীণ পরিবহন, উন্নত বীজের গবেষণা ও ফসল শুকানোর সুবিধা তৈরিতে ব্যবহার করা যেত।
এ ছাড়া বেশি দামের সুবিধা সব কৃষক সমানভাবে পান না। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৯০ হাজার ক্ষুদ্র কৃষকের জমির পরিমাণ আধা হেক্টরেরও কম। গ্রামীণ পরিবারের অনেকেই নিজেদের উৎপাদনের চেয়ে বেশি খাদ্য কেনেন। তাঁদের জন্য চালের দাম বেড়ে যাওয়া আয়ের সুবিধা নয়, বরং সংসারের ওপর বাড়তি চাপ।

সহায়তা হোক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে তাদের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এ ধরনের সহায়তা বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো বা কমানো উচিত।
ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান কর্মসূচিতে ৩ কোটি ৩২ লাখ মানুষকে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার হিসাব করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ টন—যে পরিমাণ চাল দ্রুত গুদাম থেকে সরানোর প্রয়োজন রয়েছে। এই মিল প্রশ্ন তুলছে, সহায়তার পরিমাণ কি ভোক্তাদের প্রয়োজন বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়েছে, নাকি গুদামের চাপ কমানোর বিষয়টিও এতে গুরুত্বপূর্ণ?
একবারে তিন মাসের চাল দিয়ে দেওয়াও ঝুঁকিমুক্ত নয়। দীর্ঘদিন সংরক্ষিত চালের মান কমে যেতে পারে। জুন মাসে দেশটির কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৫৩ লাখ টন মজুতের মধ্যে ৯৩ হাজার ৪৮৮ টন চালের মান নেমে গিয়েছিল। সেগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ এবং নতুন চালের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মেশানোর পরই সরকারি সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।
সরকার ইতিমধ্যে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ভর্তুকির মাধ্যমে ২০ লাখ টন চাল বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু গুদাম পূর্ণ হওয়ার কারণে নয়, খুচরা দাম নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেই বাজারে হস্তক্ষেপ করার মতো নিয়ম থাকা দরকার। যেসব এলাকায় চালের উদ্বৃত্ত রয়েছে, সেখানে সরাসরি চাল বিতরণের বদলে ইলেকট্রনিক ভাউচার চালু করলে স্থানীয় বাজারেও অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে।
মজুত ব্যবস্থাপনায় চাই স্বচ্ছতা ও সীমা

ইন্দোনেশিয়ার খাদ্যনীতিতে অন্তত চারটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, চালের মজুতের জন্য নির্দিষ্ট সীমা ও সংরক্ষণকাল নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো চাল আগে বিতরণের নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং মজুতের বয়স নিয়ে নিয়মিত নিরীক্ষা প্রকাশ করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, বাজারদরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে সরকারি চাল ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, গুদাম নির্মাণে ব্যয়ের পাশাপাশি সেচ, বীজ গবেষণা ও গ্রামীণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আয় বাড়ার সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলায় এবং চালের বাইরে শাকসবজি ও প্রাণিজ খাদ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। তাই শুধু চাল উৎপাদন ও মজুতের ওপর নির্ভরশীল নীতি দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না।
চতুর্থত, চাল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বচ্ছ ও কঠোর শর্তে। মালয়েশিয়াসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে চাল বিক্রির আগে নিশ্চিত করতে হবে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম নির্ধারিত সীমার নিচে রয়েছে এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক মজুত থাকবে। খরার ঝুঁকি মোকাবিলায় যে মজুতকে বীমা হিসেবে তুলে ধরা হয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বেশি থাকার সময় তা বিদেশে বিক্রি করা দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হবে না।
কৃষক ও বুলোগের বিপুল পরিমাণ ধান সংগ্রহের সক্ষমতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মোকাবিলায় কৌশলগত খাদ্য মজুতও অপরিহার্য। কিন্তু গুদামে চালের পাহাড় গড়ে তোলা নিজে কোনো সাফল্যের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। সেই চাল দরিদ্র মানুষের নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পারছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন।
খাদ্যনিরাপত্তা গুদামের হিসাব দিয়ে নয়, মানুষের রান্নাঘর ও জীবিকার বাস্তবতা দিয়ে বিচার করতে হবে। উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান এবং সাশ্রয়ী খাদ্যের সুযোগ নিশ্চিত না হলে বিপুল মজুতও ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
লেখক গাদজাহ মাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি-সমাজঅর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক এবং ভূগোল বিষয়ে পিএইচডি গবেষক।












