বিশ্বের খাদ্যবাজার এখন এমন এক অনিশ্চয়তার মুখে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের নিরাপত্তা আর দূরবর্তী দেশের মানুষের খাবারের দামের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ব্ল্যাক সি-তে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্যশস্য, সার, জ্বালানি ও পরিবহনব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে। ইউক্রেনের বন্দরগুলো সচল রাখা তাই আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নের চেয়েও বড়—এটি বৈশ্বিক খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত।
এই বাস্তবতায় ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নয়াদিল্লি ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে ব্ল্যাক সি-তে নৌপরিবহনের নিরাপত্তাকে আলোচনার একটি সূচনা হিসেবে সামনে এনেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে ভারতের ভূমিকা এখন শুধু আহ্বান জানানোর মধ্যে সীমিত নয়; দেশটি দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা ভারতের প্রস্তাবকে বিবেচনাধীন উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত বলে স্বাগত জানিয়েছেন।
তবে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগ তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন যুদ্ধরত পক্ষগুলো নিজেরা অর্থবহ আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাসও এ কথাই বলেছেন। তাঁর অবস্থান স্পষ্ট: ইউক্রেন ও রাশিয়াকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে হবে; অন্যরা মধ্যস্থতা বা সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার কাজে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়াকে আগ্রাসন বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি মেনে আন্তর্জাতিক আইনসম্মত, ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথে আলোচনায় অংশ নিতে হবে।
খাদ্য রপ্তানির পথ যখন যুদ্ধের লক্ষ্য

ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে দেশটি বছরে এত খাদ্য উৎপাদন করত, যা দিয়ে প্রায় ৪০ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল। যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনের কৃষকেরা জমিতে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু উৎপাদন করলেই খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছায় না। নিরাপদ বন্দর, সচল রেলপথ এবং নির্ভরযোগ্য জাহাজ চলাচল ছাড়া কৃষিপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো কঠিন।
ইউক্রেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির ১ হাজার ১৬৬টি বন্দর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৬৮টি বেসামরিক জাহাজও। ব্ল্যাক সি-র প্রধান বন্দরগুলো দিয়ে ঐতিহ্যগতভাবে ইউক্রেনের প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষিপণ্য রপ্তানি হতো। কিন্তু চলতি বছরের ২২ জুলাইয়ের পর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এই বন্দরগুলোর দৈনিক গড় পণ্য ওঠানো-নামানোর পরিমাণ ২ লাখ ১৫ হাজার ৩০০ টন থেকে কমে আগস্টের শেষে প্রায় ১৪ হাজার টনে নেমে আসে।
এই পতন কেবল ইউক্রেনের রপ্তানি আয় কমার ঘটনা নয়। এর অর্থ, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের একটি বড় উৎস হঠাৎ করে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে ইউক্রেন প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ টন শস্য ও তেলবীজ উৎপাদনের প্রত্যাশা করছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৪৪ লাখ টন রপ্তানি করতে হবে। নিরাপদ পরিবহন দীর্ঘদিন ব্যাহত থাকলে এই বিপুল উৎপাদন বিশ্ববাজারে পৌঁছানো কঠিন হবে। খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো তখন বেশি দামে পণ্য কেনার ঝুঁকিতে পড়বে।
বিকল্প পথের সীমাবদ্ধতা
ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি সচল রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২২ সালের মে মাস থেকে ‘সলিডারিটি লেনস’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিকল্প পরিবহনপথ গড়ে তুলেছে। এর আওতায় সড়ক, রেলপথ ও সীমান্ত পারাপার ব্যবহার করে কৃষিপণ্য ইউরোপের বাজার এবং অন্যান্য গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইউক্রেনের শস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৃষকদের অর্থায়নেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
ব্ল্যাক সি-র পথ বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে দানিয়ুব নদীর বন্দর, রেলপথ, সড়ক ও স্থলসীমান্তের গুরুত্ব বাড়ে। কিন্তু এসব পথের ধারণক্ষমতা সীমিত, পরিবহনব্যয় বেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগও তুলনামূলক কম। বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি হলেও তা ব্ল্যাক সি-র বড় বন্দরগুলোর কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
এ ছাড়া রেলপথের ওপর ধারাবাহিক হামলা বিকল্প পরিবহনব্যবস্থাকেও দুর্বল করছে। ইউক্রেনের রেল অবকাঠামোতে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর ৬ হাজারের বেশি হামলা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু ২০২৬ সালেই ১ হাজার ৫৯৩টি। ফলে রপ্তানির সমস্যা শুধু বন্দরকেন্দ্রিক নয়; উৎপাদনস্থল থেকে পণ্য পরিবহনের পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কৃষক আজকের ফসল বিক্রি করতে না পারলে আগামী মৌসুমের বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ কেনার অর্থও হারান। অর্থাৎ পরিবহনব্যবস্থার ওপর হামলা শুধু বর্তমান সরবরাহ কমায় না, ভবিষ্যৎ উৎপাদনের সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বিশ্ববাজারে আরও গভীর হতে পারে।
খাদ্যসহায়তা ও বৈশ্বিক দায়িত্ব
যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেন আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘গ্রেইন ফ্রম ইউক্রেন’ কর্মসূচি পরে ‘ফুড ফ্রম ইউক্রেন’ নামে সম্প্রসারিত হয়েছে। এই উদ্যোগে ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে এবং ২০টি গন্তব্যে প্রয়োজনীয় মানুষের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখন কর্মসূচিটি ইউক্রেনের কৃষি-দক্ষতা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার দিকেও এগোচ্ছে।
তবে মানবিক সহায়তা দিয়ে নিয়মিত বাণিজ্যিক সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল উৎপাদন, পূর্বানুমানযোগ্য রপ্তানি এবং এমন পরিবহনব্যবস্থা, যা যুদ্ধের প্রতিটি উত্তেজনায় অচল হয়ে পড়বে না। কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারকে সচল রাখতে বাণিজ্যিক জাহাজ, বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ব্ল্যাক সি-তে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল সুরক্ষিত করার কোনো কার্যকর সমঝোতা হলে তার সুফল ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে যাবে। কৃষিপণ্যের রপ্তানি স্থিতিশীল হতে পারে, জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি কমতে পারে এবং খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা তাই শুধু যুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নয়; বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষারও অংশ।
ভারতের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভারত দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, সার, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের সরবরাহে বিঘ্নের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এসব পণ্যের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বড় সমস্যা। এসব দেশের অনেকেরই বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলানোর আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। তাই ইউক্রেন ও রাশিয়া—দুই পক্ষের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ এবং ব্ল্যাক সি-তে নিরাপদ নৌপরিবহনের ওপর জোর দেওয়ার কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।

তবে কূটনৈতিক উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। বন্দরকে আক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং পরিবহন অবকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধ করা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিকল্প রপ্তানিপথ চালু রাখা প্রয়োজন, কিন্তু সেগুলোকে মূল সমাধান হিসেবে দেখলে বাস্তব সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করা হবে।
ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিকল্প রপ্তানিপথ সচল রাখতে কাজ চালিয়ে যাবে। কিন্তু ব্ল্যাক সি-তে নিরাপদ নৌচলাচলের প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জাহাজকে নিরাপদে চলতে হবে, বন্দরকে কাজ করতে হবে, আর উৎপাদিত খাদ্যকে পৌঁছাতে হবে মানুষের কাছে।
যুদ্ধের অবসানই এই সংকটের সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। তত দিন পর্যন্ত ব্ল্যাক সি-র নিরাপত্তাকে শুধু সামরিক বা আঞ্চলিক প্রশ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্ব খাদ্যবাজারের স্থিতিশীলতা, আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি—সবই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।












