ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সৌদি আরবের রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লোহিত সাগরের নৌপথে হুমকি এবং উন্নত অস্ত্রপ্রযুক্তি ব্যবহারের প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে হুতিরা এমন এক নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে, যার প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া নয়, সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তিন শতাধিক মানুষ নিহত, মৃত্যুপথযাত্রী কিংবা আহত হন। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা কর্মী ইবতেহাল বিনতে আবদুল্লাহ নিজেও আহত হয়েও অন্যদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। মেঝেতে পড়ে থাকা একটি ওড়না দিয়ে আহত এক ব্যক্তির ক্ষত বেঁধে দেন, জরুরি বহির্গমন পথ খুলে দেন এবং যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। পরে আহত অবস্থাতেই আবার ফিরে গিয়ে উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন।
এই ঘটনা সন্ত্রাসের মুখে মানুষের সাহসের উদাহরণ। কিন্তু ব্যক্তিগত সাহস দিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামরিক সক্ষমতা এবং অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা আর উপেক্ষার সুযোগ নেই

হুতি নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি প্রায় দুই দশক ধরে ইরানের সমর্থনে একটি সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী একাধিক শান্তিচুক্তিতে সম্মত হলেও সেগুলো ভেঙে আবার সংঘাতে ফিরেছে। প্রতিটি যুদ্ধবিরতিকে নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ ও পরবর্তী আক্রমণের প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
হুতিদের সক্ষমতা এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরবের দিকে এক হাজারের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে তারা। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, হুতি প্রকৌশলীরা পূর্ব আফ্রিকার সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবকে বোমা তৈরি ও ড্রোন পরিবর্তনের কৌশল শিখিয়েছেন। গত মাসে একটি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জানায়, উত্তর ইয়েমেনের হুতিনিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট দল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরিতে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল।
এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখলে বৃহত্তর চিত্রটি আড়ালে থেকে যায়। একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরি করতে পারে, অন্য গোষ্ঠীর কাছে প্রযুক্তিগত জ্ঞান পৌঁছে দিতে পারে এবং নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে অস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করে, তখন তার প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
ইসলামিক স্টেটের উত্থানের আগেও বিশ্ব এই ধরনের হুমকিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। ইরাকের মসুল দখল করে খিলাফত ঘোষণার আগে গোষ্ঠীটির সামরিক শক্তি ও বিস্তারের সম্ভাবনা অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি ছিল। হুতিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অবমূল্যায়ন বিপজ্জনক হতে পারে।
লোহিত সাগরের সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকেও আঘাত করতে পারে
হুতিদের হুমকির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাব আল-মান্দাব প্রণালি। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়। সেখানে নৌ চলাচল বন্ধ বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা, পণ্য পরিবহনের ব্যয় এবং জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
চলতি মাসে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুতিদের হামলার পর তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ওঠে। অর্থাৎ সংঘাতের প্রভাব শুধু হামলার শিকার দেশগুলোর নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর অর্থনৈতিক অভিঘাতও আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছাতে পারে।
এই বাস্তবতায় হুতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপকে কেবল সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা রক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত।
ইয়েমেনের নেতৃত্বেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে
হুতিদের পরাজিত করার কৌশলে ইয়েমেনের সরকার ও জনগণকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। ২০১৫ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের সরকারের অনুরোধে সৌদি আরব সংঘাতে জড়ায়। দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছেন ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। বাস্তুচ্যুতি, সহিংসতা ও মানবিক সংকটের মধ্যে তাঁদের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে।

তাই হুতিদের সামরিক শক্তি ভাঙার লক্ষ্য যেমন জরুরি, তেমনি ইয়েমেনের জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখাও অপরিহার্য। সৌদি আরবের অবস্থান হলো, ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় দেশটির সরকার ও জনগণের নেতৃত্ব থাকতে হবে।
বর্তমানে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী লোহিত সাগর উপকূল, আল-জাওফ ও মারিব অঞ্চলে অভিযান চালাচ্ছে এবং সৌদি আরব আকাশপথে সহায়তা দিচ্ছে। হুতিদের জন্য পাঠানো ৭৫০ টনের বেশি অস্ত্র ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও অস্ত্রের গুদাম লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে সামরিক অভিযান একা যথেষ্ট হবে না। হুতিদের অর্থনৈতিক কাঠামো, চাঁদাবাজি এবং ছদ্মবেশী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পথ বন্ধ করতে হবে। অস্ত্র ও অর্থের প্রবাহ ঠেকাতে সমুদ্রপথে নজরদারি জোরদার করা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার জন্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সৌদি আরবের অবস্থান, অন্য দেশগুলোরও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তবে শুধু তালিকাভুক্ত করলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না; নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, অর্থের উৎস বন্ধ এবং অস্ত্র সরবরাহ রোধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিশুদের উগ্রবাদে ঠেলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে
হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে শিশুদের উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত করা এবং যুদ্ধে পাঠানোর বিষয়টিও গুরুতর। দশ বছর বয়সী শিশুদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়ানো এবং হাজারো শিশুকে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ শুধু নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আঘাত।
কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দুর্বল করার পাশাপাশি তার নিয়োগব্যবস্থা ও মতাদর্শিক প্রভাব বিস্তারের পথ বন্ধ করাও জরুরি। অন্যথায় সামরিক পরাজয়ের পরও নতুন প্রজন্মের মধ্যে সহিংসতার বীজ থেকে যেতে পারে।

ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাহিনী ও ৮০টির বেশি দেশের সমন্বয়ে গঠিত জোট যে ধরনের অভিযান চালিয়েছিল, হুতিদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে ইয়েমেনের বাস্তবতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে।
হুতিদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে উত্থান থামানো এবং ইয়েমেনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশ তৈরি করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়। বরং স্থায়ী শান্তির জন্য দুটিই প্রয়োজন। ইয়েমেনের মানুষকে সহিংসতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিতে হলে হুতিদের অস্ত্র, অর্থ ও নিয়োগের নেটওয়ার্ক ভাঙার পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
রিয়াদের বিমানবন্দরে ইবতেহাল আবদুল্লাহ আহত হয়েও মানুষের জীবন বাঁচাতে ফিরে গিয়েছিলেন। তাঁর সাহস একটি সংকটময় মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব হলো, এমন পরিস্থিতি যেন বারবার তৈরি না হয়, সেই লক্ষ্যেই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া।
হুতিদের সামরিক সন্ত্রাস বন্ধ করা শুধু একটি দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটি ইয়েমেনের মানুষের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। এই লক্ষ্য অর্জনে দ্বিধা ও বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বদলে দরকার সমন্বিত, ধারাবাহিক এবং ইয়েমেনের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে এমন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।
রিমা বান্দার আল-সৌদ যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত।












