ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমির শেয়ারে ফ্ল্যাট কেনার আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে হাজার হাজার ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। জমির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তুলনামূলক কম টাকায় জমির অংশীদারত্ব ও ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার আশায় এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করছেন অনেকে। কিন্তু কোথাও অনুমোদনহীন প্রকল্প, কোথাও জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা, আবার কোথাও একই জমির শেয়ার একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রির অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
সুপ্রিম কোর্ট ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা জড়িত এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
একই জমির শেয়ার একাধিকবার বিক্রির অভিযোগ
ঢাকায় ১১টি আবাসন প্রকল্পের নামে ৪৭০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি জমির শেয়ার বিক্রি এবং ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তদন্তের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করে। এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হায়দার কবির মিথুনকে মে মাসে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।
উত্তরখানের একটি প্রকল্পে ১০ কাঠা জমির ৩৬টি শেয়ার বিক্রি করে সেখানে নয়তলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পটির একজন বিনিয়োগকারী আসাদুল ইসলাম রুমন জানান, ২০২২ সালে চুক্তি করে তিনি একটি শেয়ারের জন্য ১৫ লাখ টাকা দেন। চুক্তিতে প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা ছিল। জমি কেনার পর বিনিয়োগকারীরা যৌথভাবে ভবন নির্মাণ করবেন—এমন শর্তও ছিল চুক্তিতে।
রুমনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের রাজউকের একটি ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা দেখিয়েছিল, যা পরে জাল বলে তাঁর সন্দেহ হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে ৩৬ জন বিনিয়োগকারীই কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন। পরে তাঁরা জানতে পারেন, একই শেয়ার আরও ৪০ জনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
এরপর জমি ক্রেতাদের নামে নিবন্ধন করে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বারবার বিলম্ব করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। একপর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারেন, প্রকল্পের জমি হিসেবে দেখানো স্থানে ভাড়া করা জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়ে আবাসন প্রকল্পের উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের সাতটি প্রকল্পে ৪৭০ জন গ্রাহক বিনিয়োগ করেছিলেন।
গত ১৩ অক্টোবর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। নিরাপত্তাকর্মী মো. জিয়াউল জানান, ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা মার্চ মাসে কার্যালয়টি ভাঙচুর করার পর থেকে সেটি বন্ধ রয়েছে।
সরকারি জমিকে ব্যক্তিমালিকানার প্রকল্প দেখানোর অভিযোগ
সিলেটে স্বপ্নছায়া আবাসনের বিরুদ্ধে ১৫০ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। লামাবাজারে ৪০ কাঠা জমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অর্থ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
প্রকল্পটিতে বিনিয়োগকারী একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মহসিন হোসেন জানান, ২০১৭ সালে স্থানীয় সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ওই জমিতে ১০তলা ভবন নির্মাণের কথা বলা হয়। প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিনিয়োগকারীদের ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের শুরুর দিকে সব শেয়ার বিক্রি হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
মহসিনের অভিযোগ, জমি নিবন্ধনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম খায়রুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বারবার সময়ক্ষেপণ করেন। পরে বিনিয়োগকারীরা জানতে পারেন, জমিটি সরকারি খাসজমি।
মহসিনের দাবি, কিছু সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় জমিটিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে শামীম ও তাঁর সহযোগীরা বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। পরে প্রকল্পের টাকা নিয়ে শামীম যুক্তরাজ্যে চলে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপের চেয়ারম্যান খুরশিদ হোসেন জানান, তাঁদের কাছে জমির শেয়ারসংক্রান্ত প্রতারণার ৫০টির বেশি অভিযোগ এসেছে। তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা সংগঠনটির সদস্য না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।
অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা ছাড়াই আবাসন ব্যবসা
ঢাকার ২০টি কথিত প্রতারণার ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৬টি অভিযোগের সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, যারা আবাসন ব্যবসার পরিচয়ে কার্যক্রম চালালেও রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয়।
এই তালিকায় রয়েছে হলিস্টিক বিল্ডার্স। প্রতিষ্ঠানটি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে নিবন্ধিত হলেও রিহ্যাবের সদস্য নয়।
আফতাবনগরে শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোমের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটিও রিহ্যাবের সদস্য নয়।
মেরুল বাড্ডায় কার্যক্রম চালানো আমার বাড়ি আমার ঘর নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৬৫ জন মামলা করেছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিতর্কিত এসব প্রকল্পের পেছনে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠানেরই ফ্ল্যাট নির্মাণ বা প্লট বিক্রির পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে করিডরেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ ধরনের শতাধিক প্রকল্প গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। নতুন আবাসনের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মুন্সিগঞ্জ জেলা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জমির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে সেখানে ৫৩৮টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২৮৬ জন ব্যক্তি এসব অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত।
মুন্সিগঞ্জের সরকারি কৌঁসুলি আবদুল আজিজ জানান, এসব মামলার অনেকগুলোই কেরানীগঞ্জ, লৌহজং ও সিরাজদিখান এলাকার প্রকল্পসংশ্লিষ্ট। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের আশপাশে আবাসনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এক হাজারের বেশি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারক চক্রগুলো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছে বলে তিনি জানান।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মামলা
সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮২৩টি মামলার মধ্যে ৫ হাজার ৯৪৮টি ঢাকা মহানগর ও জেলা আদালতে রয়েছে। এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামে বিচারাধীন ৩৮৬টি মামলায় সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। নারায়ণগঞ্জে ২৮৬টি মামলায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা এবং সিলেটে ২১৩টি মামলায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা জড়িত।
এ ছাড়া গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার এই পরিসংখ্যান জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন খাতে ক্রেতাদের ঝুঁকির ব্যাপকতা তুলে ধরছে। তবে বিচারাধীন মামলার অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে সেগুলোকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
আইন থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদ জানান, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৯ ও ২০ ধারায় নিবন্ধন ছাড়া আবাসন ব্যবসা পরিচালনা এবং অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প উন্নয়ন বা বিক্রির বিষয়ে বিধান রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনের ২৪ ধারায় ক্রেতার অজ্ঞাতে চুক্তিবদ্ধ সম্পত্তি অন্যের কাছে অবৈধভাবে বিক্রির শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ৩১ ধারায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অপরাধের ক্ষেত্রে তার মালিক, পরিচালক ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। তবে আবাসন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য গঠিত একটি সেল অভিযোগকারীদের কার্যকর প্রতিকার দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন কামাল।
আবাসন প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব রাজউকের ওপরও রয়েছে। কিন্তু কিছু অসাধু আবাসন ব্যবসায়ীর সঙ্গে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল জানান, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনটির সদস্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে রিহ্যাবের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বিনিয়োগকারীদের জমি বা ফ্ল্যাট কেনার আগে আবাসন প্রতিষ্ঠানের রিহ্যাব সদস্যপদ, রাজউকের অনুমোদন এবং জমির মালিকানাসংক্রান্ত নথি যাচাই করার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে রাজউক ও আবাসন মন্ত্রণালয়কে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজউকের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সদস্য এবং সংস্থাটির মুখপাত্র মো. শাহিনুর আলম জানান, অননুমোদিত আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জমির শেয়ারভিত্তিক কয়েকটি অবৈধ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্পের বিষয়ে অভিযোগ পেলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আবাসনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ক্রেতাদের বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতে জমির মালিকানা যাচাই, অনুমোদন নিশ্চিত করা, প্রতারণার অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।












