খুলনার রূপসা, ভৈরব ও আতাই নদী এবং সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার খালগুলো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাস। এসব নদী ও সংলগ্ন জলপথে রয়েছে বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন, স্থানীয়ভাবে পরিচিত শুশুক এবং উপকূলীয় ও লবণাক্ত পানির পরিবেশে বসবাসকারী ইরাবতী ডলফিন। নদীর পানিতে শ্বাস নিতে ভেসে ওঠা এই স্তন্যপায়ী প্রাণীগুলো শুধু সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়; তাদের টিকে থাকা নদী ও জলাভূমির পরিবেশগত স্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।
কিন্তু দূষণ, মাছ ধরার জালে আটকে মৃত্যু, নৌযানের চলাচল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এবং আবাসস্থলের অবক্ষয় ডলফিনের অস্তিত্বকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি ডলফিন অ্যাটলাসে খুলনা অঞ্চলের রূপসা–ভৈরব–আতাই নদী এলাকা এবং সুন্দরবনকে গাঙ্গেয় ডলফিনের গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দুই প্রজাতির ডলফিন, ভিন্ন আবাস
বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় জলপথে ডলফিনের একাধিক প্রজাতি পাওয়া যায়। খুলনা অঞ্চলের ক্ষেত্রে গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গাঙ্গেয় ডলফিন মূলত মিঠাপানির নদীব্যবস্থায় বসবাস করে। নদীর গভীরতা, পানির প্রবাহ এবং মাছের প্রাপ্যতা তার টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইরাবতী ডলফিন সুন্দরবনের মোহনা ও মাঝারি থেকে বেশি লবণাক্ততাযুক্ত জলপথে বসবাস করে। সুন্দরবন এমন একটি বিরল পরিবেশ, যেখানে এই দুই প্রজাতির ডলফিনের আবাসস্থল পরস্পরের কাছাকাছি বিস্তৃত।
ডলফিনের উপস্থিতি তাই শুধু প্রাণী দেখার অভিজ্ঞতা নয়। তারা খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং নদীর পরিবেশের পরিবর্তন বোঝার একটি প্রাকৃতিক সূচক। মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, পানিতে দূষণ বাড়া কিংবা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে ডলফিনের জীবনও বিপন্ন হয়।
জাতীয় জরিপে কী জানা গেছে
২০২৪–২০২৫ সালে বন অধিদপ্তর ও ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির যৌথ জরিপে বাংলাদেশের ৪৫টি নদীর প্রায় ৪ হাজার ৮৯৩ কিলোমিটার এলাকায় ২ হাজার ৩০৭টি গাঙ্গেয় ডলফিন শনাক্ত করা হয়। জরিপে দেশের নদীগুলোতে ডলফিনের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল চিহ্নিত করার পাশাপাশি দূষণ ও মাছ ধরার জালের ঝুঁকিও উঠে আসে।
তবে এই সংখ্যা খুলনা অঞ্চলের ডলফিনের আলাদা হিসাব নয়। একইভাবে, গাঙ্গেয় ডলফিনের জাতীয় জরিপের ফল দিয়ে সুন্দরবনের ইরাবতী ডলফিনের বর্তমান সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। দুই প্রজাতির আবাসস্থল ও বিস্তৃতি আলাদা হওয়ায় তাদের অবস্থা বুঝতে পৃথক ও নিয়মিত জরিপ প্রয়োজন।
সুন্দরবনের ডলফিন নিয়ে আগের গবেষণাগুলোও এ অঞ্চলের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। ২০০১ সালের একটি জরিপে সুন্দরবনের তুলনামূলক কম লবণাক্ত পানির এলাকায় ২২৫টি গাঙ্গেয় ডলফিন পাওয়া গিয়েছিল বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে পুরোনো জরিপের সংখ্যা বর্তমান জনসংখ্যার নির্ভরযোগ্য হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
মাছ ধরার জাল হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী ফাঁদ
ডলফিনের জন্য বড় বিপদ মাছ ধরার জাল, বিশেষ করে গিলনেট বা ফুলকায় আটকে মাছ ধরার জাল। নদীতে শিকার করতে গিয়ে ডলফিন এসব জালে আটকে গেলে পানির ওপরে উঠে শ্বাস নিতে পারে না। ফলে ডুবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সুন্দরবনে ডলফিনের মৃত্যু নিয়ে ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটির একটি পর্যবেক্ষণ কর্মসূচিতে ২০০৭ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ৪০টি গাঙ্গেয় ডলফিন ও ১২টি ইরাবতী ডলফিনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়। পরীক্ষা করা ২৬টি গাঙ্গেয় ডলফিনের মৃতদেহের মধ্যে ১৩টির মৃত্যুর কারণ হিসেবে মাছ ধরার সরঞ্জামে আটকে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। দুটি ডলফিনের মৃত্যুর সঙ্গে নৌযানের সংঘর্ষের সম্পর্ক শনাক্ত করা হয়েছিল।
এই তথ্যগুলো পুরোনো হলেও সমস্যাটির প্রকৃতি স্পষ্ট করে। মাছ ধরার অনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি এবং ডলফিনের বিচরণক্ষেত্রে জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাদের অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর ঝুঁকি থেকেই যায়।
দূষিত পানিতে খাবারের সংকট
শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক এবং প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নদীর পানির গুণগত মান নষ্ট করে। দূষণের কারণে মাছের প্রজাতি ও সংখ্যা কমে গেলে ডলফিনের খাদ্যসংকট তৈরি হয়। পানিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি তাদের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
খুলনা অঞ্চলের নদীগুলোকে এই বৃহত্তর পরিবেশগত সংকট থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নদীর পানি দূষিত হলে শুধু ডলফিন নয়, মাছ, কচ্ছপ, অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডলফিনের উপস্থিতি নদীর স্বাস্থ্যের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিতে পারে। অন্যদিকে, তাদের সংখ্যা কমে যাওয়া বা কোনো এলাকায় আর দেখা না যাওয়া পরিবেশগত অবনতির সতর্কসংকেত হতে পারে। তবে শুধু ডলফিনের দেখা পাওয়া বা না পাওয়ার ভিত্তিতে কোনো নদীর সামগ্রিক অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না; পানির গুণগত মান, খাদ্যের প্রাপ্যতা ও নিয়মিত প্রাণী জরিপের তথ্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
নৌযান, শব্দ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন
খুলনা ও সুন্দরবন অঞ্চলের নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজ, যাত্রীবাহী নৌযান, মাছ ধরার ট্রলার এবং পর্যটকবাহী নৌকার চলাচল রয়েছে। নৌযানের প্রপেলারের আঘাতে ডলফিন আহত বা নিহত হতে পারে। পানির নিচে ইঞ্জিনের শব্দ ও অবিরাম চলাচল তাদের স্বাভাবিক বিচরণ এবং খাদ্য অনুসন্ধানেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এ ছাড়া উজানে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ, পানি প্রত্যাহার এবং নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির গভীরতা ও প্রবাহ বদলে যেতে পারে। এতে ডলফিনের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়, কোনো কোনো এলাকায় খাবারের প্রাপ্যতা কমে এবং বিচ্ছিন্ন জলপথে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ডলফিন অ্যাটলাসে বাংলাদেশের কয়েকটি উপনদীর শীতকালীন আবাসস্থল অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তনও ডলফিনের আবাসস্থলে চাপ বাড়াতে পারে। সুন্দরবনের মতো জোয়ার-ভাটানির্ভর পরিবেশে মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভারসাম্য বদলে গেলে কিছু প্রজাতির জন্য উপযোগী আবাসস্থল সংকুচিত হতে পারে।
সংরক্ষিত এলাকায় সুরক্ষা কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশে ডলফিনের আবাসস্থল রক্ষায় কয়েকটি অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সুন্দরবনের চাঁদপাই, ঢাংমারি ও দুধমুখীসহ বিভিন্ন এলাকায় ডলফিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব এলাকায় ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ এবং নৌযানের চলাচল ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শুধু অভয়ারণ্য ঘোষণা করলেই ডলফিন নিরাপদ হয় না। নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ, জেলেদের সচেতনতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া সংরক্ষিত এলাকাও ঝুঁকিমুক্ত থাকে না। ডলফিনের মৃত্যু হলে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করাও জরুরি, যাতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
খুলনা অঞ্চলে ডলফিন রক্ষার জন্য তাই কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়: নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, মাছ ধরার ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, ডলফিনের বিচরণক্ষেত্রে নৌযানের গতি ও চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা। পাশাপাশি নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপের মাধ্যমে প্রজাতিভিত্তিক সংখ্যা ও আবাসস্থলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ডলফিন বাঁচলে নদীর ভবিষ্যৎও নিরাপদ হবে
খুলনার নদী ও সুন্দরবনের জলপথে ডলফিনের অস্তিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর পানি, মাছের প্রাচুর্য, জলজ প্রাণীর বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা।
ডলফিনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। তাই একটি মাত্র পদক্ষেপে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণ, টেকসই মাছ ধরার ব্যবস্থা, নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নদীর প্রবাহ ও আবাসস্থল রক্ষা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
বুড়িগঙ্গা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বাংলাদেশের নদীগুলোতে ডলফিনের টিকে থাকার লড়াই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে: নদীকে শুধু পরিবহন ও সম্পদ আহরণের মাধ্যম হিসেবে দেখা হবে, নাকি জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনধারণের ভিত্তি হিসেবেও সংরক্ষণ করা হবে? খুলনার নদীগুলোতে শুশুকের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।












