প্রকৃতির মাঝে পাখি দেখা শুধু অবসর কাটানোর আনন্দদায়ক উপায় নয়, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পাখি দেখা ও বিভিন্ন প্রজাতি শনাক্ত করার অভ্যাস মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলের কার্যকলাপ এবং গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে মনোযোগ, দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে তথ্য বোঝা এবং পরিচিত-অপরিচিত পাখি চিনতে পারার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অঞ্চলগুলোতে অভিজ্ঞ পাখিপ্রেমীদের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে। এসব পরিবর্তন বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অবক্ষয় ধীর রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। তবে পাখি দেখার অভ্যাস সরাসরি স্মৃতিভ্রংশ প্রতিরোধ করে বা মস্তিষ্কের বার্ধক্য ঠেকায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ফোর্জ মিল লেকের পাশে প্রতি সপ্তাহে একদল প্রবীণ মানুষ পাখি দেখতে জড়ো হন। কাঠের তৈরি একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে বসে দূরবীন দিয়ে তাঁরা পাখির গতিবিধি লক্ষ করেন। কেউ পাথুরে জমিতে লম্বা ঠোঁট দিয়ে খাবার খুঁজতে থাকা পাখির কথা বলেন, কেউ আবার পানিতে ভেসে বেড়ানো ঝুঁটিওয়ালা ডুবুরি পাখির দিকে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এই দলের অনেকেরই দিনের শুরুতে কী ঘটেছে, তা মনে রাখতে সমস্যা হয়। কারও কারও জন্য কথোপকথন অনুসরণ করাও কঠিন। কিন্তু পাখি দেখার সময় তাঁদের মধ্যে আগ্রহ ও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। পাখি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁরা আনন্দ প্রকাশ করেন, অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং চারপাশের প্রকৃতির প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন।
দলটির ৭৮ বছর বয়সী সদস্য হ্যারল্ডের জীবনে এমন অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একসময় তিনি প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। কিন্তু ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশজনিত সমস্যার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনেকটা গুটিয়ে গিয়েছিলেন এবং উদ্বিগ্ন থাকতেন। তাঁর মেয়ে লুসি বাবাকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার আশায় এই পাখি দেখার দলে নিয়ে আসেন।
প্রথমে কিছুটা অস্বস্তিতে থাকলেও পরে একটি রবিন পাখি দেখিয়ে দেওয়ার পর হ্যারল্ডের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। পানিতে হাঁসের ছটফটানি দেখে তিনি আনন্দ পান। কাছের গাছের ডালে নীলচে ছোট পাখিদের উড়ে বেড়াতেও দেখেন তিনি। দীর্ঘদিন পর বাবাকে হাসতে দেখে লুসি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
যুক্তরাজ্যের বয়স্ক ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করা সংস্থা এজ ইউকের কমিউনিটি ডিমেনশিয়া পরামর্শক জেনি বুডিঙ্গার বলেন, ওই মুহূর্তে হ্যারল্ড নিজের স্মৃতিশক্তি বা আত্মবিশ্বাস নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তিনি বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দিতে পেরেছিলেন। শান্ত ও কোমল এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক।
মস্তিষ্কের গঠনে কী পরিবর্তন দেখা যায়
পাখি দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন কানাডার টরন্টোর বেক্রেস্ট একাডেমি ফর রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের স্নায়ুবিজ্ঞানী এরিক উইং ও তাঁর সহকর্মীরা। তাঁরা অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষক এবং নতুনদের পাখি শনাক্ত করার দক্ষতা যাচাই করেন। পাশাপাশি পাখি শনাক্ত করার সময় তাঁদের মস্তিষ্কের এমআরআই চিত্র বিশ্লেষণ করেন।
গবেষণায় দেখা যায়, অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলের কার্যকলাপ ও সংযোগের ধরন নতুনদের তুলনায় আলাদা। বিশেষ করে মনোযোগ, দৃষ্টির মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ এবং দৃশ্যমান বস্তু শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলোতে এই পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এসব অঞ্চলে বেশি কার্যকলাপ দেখা গেছে। বিশেষত তাঁদের আগে পরিচিত নয়, এমন পাখি শনাক্ত করতে বলা হলে এই সক্রিয়তা বেশি ছিল। অর্থাৎ, নতুন কোনো পাখি চিনতে গিয়ে তাঁদের মস্তিষ্ককে দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ, আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা এবং নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ করতে হয়েছে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এর পেছনে মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীলতার ভূমিকা থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞতা, শেখা ও অনুশীলনের প্রভাবে মস্তিষ্কের সংযোগ এবং কার্যপ্রণালিতে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন দক্ষতা অর্জন, খেলাধুলা শেখা কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুশীলনের ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন দেখা যায়।
তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, মস্তিষ্কের এই পার্থক্য পাখি দেখার অভ্যাসের কারণে তৈরি হয়েছে, নাকি আগে থেকেই যাঁদের মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্য আলাদা ছিল, তাঁরাই পাখি শনাক্ত করার দক্ষতা বেশি অর্জন করেছেন। এই সম্পর্কের প্রকৃতি বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার।
গবেষকেরা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংগঠন ও পারস্পরিক সামঞ্জস্যও বিশ্লেষণ করেন। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু সংযোগ ও সংগঠনের মাত্রা কমতে পারে। আবার মস্তিষ্কের সংগঠন দুর্বল হওয়ার সঙ্গে চিন্তা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
উইংয়ের গবেষণায় একই বয়সের নতুন পাখি পর্যবেক্ষকদের তুলনায় অভিজ্ঞদের মস্তিষ্কের কিছু অঞ্চলে বেশি সংগঠিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এর মধ্যে এমন কিছু অঞ্চলও ছিল, যেগুলো পাখি শনাক্ত করার সময় বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ফলাফল বয়স বাড়ার পরও মস্তিষ্কের কিছু সংগঠিত বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। তবে এর সঙ্গে সামগ্রিক স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতার সম্পর্ক কতটা গভীর, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উইংয়ের মতে, জীবনের তুলনামূলক কম বয়সে কোনো জটিল দক্ষতা অর্জন করলে তার কিছু সুফল বৃদ্ধ বয়সেও থাকতে পারে। তাই শুধু অবসরপ্রাপ্ত মানুষেরাই নন, তরুণদের মধ্যেও পাখি দেখার অভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্ব রয়েছে।
ডিমেনশিয়ায় পাখি দেখা কীভাবে সহায়তা করে
পাখি শনাক্ত করার বিশেষ দক্ষতা না থাকলেও পাখি দেখার মানসিক উপকার পাওয়া সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, মনোযোগ এবং আগ্রহ মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও ভালো থাকার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
পোল্যান্ডের ৩৮৮ জন পাখি পর্যবেক্ষকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা পাখি দেখাকে নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন এবং এ কাজে গভীর আগ্রহ অনুভব করেন, তাঁদের মধ্যে মানসিক প্রশান্তি ও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার অনুভূতি তুলনামূলক বেশি ছিল। অন্যদিকে, কেবল দক্ষতা বেশি থাকলেই একই মাত্রার মানসিক উপকার পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ, পাখির নাম বা প্রজাতি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারাই মূল বিষয় নয়। বরং পাখির প্রতি কৌতূহল, তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহও গুরুত্বপূর্ণ।
জার্মানির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আইখস্ট্যাট-ইঙ্গোলস্টাডের সামাজিক ও সাংগঠনিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিজাবেথ কালস প্রবীণদের ওপর পাখি দেখার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর দলের উদ্যোগে দেশটির ৬৫টি প্রবীণ নিবাসের বাইরে পাখিদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এমনভাবে এসব স্থান তৈরি করা হয়েছিল, যাতে বাসিন্দারা ঘরের ভেতরের সাধারণ বসার জায়গা থেকেই পাখি দেখতে পারেন।
গবেষকেরা বাসিন্দাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, পরিচর্যাকারীদের পর্যবেক্ষণ এবং পরিবারের সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে তাঁদের চিন্তাশক্তি, চলাফেরার সক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতার পরিবর্তন মূল্যায়ন করেন।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। এক মাস পর পাখি দেখার অভ্যাস বাসিন্দাদের ভালো থাকার অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁদের বয়স বা পরিচর্যার মাত্রার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে গবেষণায় দেখা যায়।
কালসের মতে, পাখি দেখায় অংশ নেওয়া প্রবীণদের মধ্যে চিন্তাভাবনার দ্রুততা ও মানসিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতার উন্নতি লক্ষ করা গেছে। তাঁরা কথোপকথনে আরও ভালোভাবে অংশ নিতে পেরেছেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং আগে দেখা পাখিদের চিনতে ও মনে রাখতে পেরেছেন। তাঁদের মনোযোগ ও সজাগতাও বেড়েছে বলে পরিচর্যাকারীরা জানিয়েছেন।
প্রবীণ নিবাসের কর্মীরাই প্রথম এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ করেন। যেসব বাসিন্দার মুখে কয়েক সপ্তাহ ধরে হাসি দেখা যায়নি, পাখি দেখতে দেখতে তাঁদের মুখেও হাসি ফিরতে শুরু করে।
কালসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে স্মৃতি ও মনোযোগের উন্নতি মাত্র তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেও লক্ষ করা সম্ভব হয়েছে। এসব ফলাফলের পর জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চলে ৪০০টিরও বেশি প্রবীণ নিবাসে পাখিদের খাবার দেওয়া এবং তাদের দেখার উপযোগী স্থান তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রাথমিক গবেষণায় সহায়তা করা স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোরও এ উদ্যোগে ভূমিকা ছিল।
তবে এসব ফলাফলকে সতর্কভাবে দেখা জরুরি। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ইতিবাচক হলেও, পাখি দেখাই সব পরিবর্তনের একমাত্র কারণ কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।
স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রেও স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখতে পাখি দেখার বিভিন্ন কর্মসূচি চালু হয়েছে। ২০১৩ সালে কানেকটিকাটের চারটি পরিচর্যা কেন্দ্রে এমন একটি উদ্যোগ শুরু হয়। পরে টেক্সাস ও কলোরাডোতেও এ ধরনের কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে।
‘বার্ড টেলস’ নামের একটি কর্মসূচিতে প্রবীণদের থাকার জায়গায় পাখিদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি পাখির আকৃতির নরম খেলনা ব্যবহার করা হয়, যেগুলো থেকে বিভিন্ন পাখির ডাকের মতো শব্দ বের হয়। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন প্রজাতির পাখি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং নিজেদের পুরোনো অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন অভিজ্ঞতার সংযোগ ঘটাতে পারেন।
এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা পাখি নিয়ে শেখার অভিজ্ঞতাকে চিন্তাশক্তি সক্রিয় রাখার একটি উপায় হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের অনেকে বলেছেন, এটি অতীতের স্মৃতি ও পরিচিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে আবার সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।
শুধু ডিমেনশিয়া নয়, স্ট্রোকের পর কথা বলা বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হয় এমন ব্যক্তিদের জন্যও পাখি পর্যবেক্ষণের কর্মসূচি চালু হয়েছে। এ ধরনের সমস্যাকে বলা হয় অ্যাফেসিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানার একটি নিবিড় অ্যাফেসিয়া পুনর্বাসন কর্মসূচিতে ২০২১ সালে পেঁচা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে এতে যুক্ত হয় বিভিন্ন পাখিকে পথপ্রদর্শকের সহায়তায় পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের ডাক শনাক্ত করার অনুশীলন। মন্টানার বিভিন্ন প্রজাতির পাখিকে কেন্দ্র করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখি পর্যবেক্ষণের উপকারিতা কেবল পাখির উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে প্রকৃতি, মনোযোগ, আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ এবং সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ একসঙ্গে যুক্ত হয়। পাখির গতিবিধি দেখা, তাদের ডাক শোনা কিংবা নতুন কোনো প্রজাতি চিনতে পারার চেষ্টা মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও আনন্দ তৈরি করে।
ঘরের জানালা থেকেও শুরু করা যায়
পাখি দেখার জন্য সব সময় বন, জলাভূমি কিংবা দূরের কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যুক্তরাজ্যে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিচর্যাকারীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রকৃতিতে হাঁটার পর পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণী দেখা ছিল জনপ্রিয় বাইরের কার্যক্রমগুলোর একটি।
তবে স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত অনেক মানুষের জন্য যাতায়াত ও উপযুক্ত স্থানে পৌঁছানো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে ঘরের জানালা থেকে পাখি দেখা সহজ বিকল্প হতে পারে। জানালার বাইরে গাছ, ঝোপ কিংবা নিরাপদ স্থানে পাখিদের খাবার রাখার ব্যবস্থা থাকলে ঘরে বসেই তাদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ, দামি দূরবীন কিংবা পাখির প্রজাতি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞানও বাধ্যতামূলক নয়। আশপাশে কোন পাখি আসে, তারা কীভাবে খাবার খোঁজে, কখন ডাক দেয় কিংবা কীভাবে উড়ে যায়—এসব লক্ষ করেই শুরু করা যায়।
গবেষক উইংয়ের মতে, পাখি দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নতুন কিছু জানার আগ্রহ। জীবনের মধ্যবয়স থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং পরিচিত পরিবেশের বাইরে কিছু আবিষ্কার করার চেষ্টা মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে।
কৌতূহল মস্তিষ্কের বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশেষ করে নরএপিনেফ্রিন ও ডোপামিনের মতো রাসায়নিক উপাদান মনোযোগ, প্রেরণা ও শেখার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় থাকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে পাখি দেখার মাধ্যমে এসব রাসায়নিকের মাত্রা বা প্রদাহে নির্দিষ্ট কী পরিবর্তন ঘটে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
জার্মানির অধ্যাপক কালসের মতে, পাখি দেখা মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নতুন করে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ হলেও দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় সেই সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। পাখিদের কাছ থেকে আবার সেই সংযোগ অনুভব করার সুযোগ পাওয়া যায় খুব সহজ একটি অভ্যাসের মাধ্যমে।
সব মিলিয়ে, পাখি দেখা মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক যোগাযোগ, মনোযোগ এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণ ও স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনে এটি আনন্দের ছোট ছোট মুহূর্ত তৈরি করতে পারে। মস্তিষ্কের বার্ধক্য ধীর করার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গবেষণা আশাব্যঞ্জক হলেও, একে ডিমেনশিয়ার চিকিৎসা বা প্রতিরোধের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।












