আরব উপদ্বীপে বিশ্বের কয়েকটি ধনী দেশের প্রতিবেশী হয়েও ইয়েমেন আজ বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র রাষ্ট্র। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দেশটির মানুষের জীবন বিপর্যস্ত। তবু এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষ স্বাভাবিক জীবনের আনন্দ খুঁজছে, সন্তানদের জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।
২০১৫ সালে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এডেনে হামলা চালায়। তখন শহরটির খোর মাকসার এলাকায় নিজের বাড়িতে ছিলেন নাসের আবদো। ফোনে সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে এখনো আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
‘তারা আমার বাড়ির আশপাশের এলাকা দখল করে নিয়েছিল। আমাদের বাড়ির কাছের একটি ছাদের ওপর হুতিদের একজন স্নাইপারও ছিল। সে যা কিছু নড়াচড়া করতে দেখত, তার ওপরই গুলি চালাত। কাকে গুলি করছে, তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। এমনকি শিশুদেরও গুলি করত,’ বলেন আবদো।
তখন খাবার কিনতে বাজারে যাওয়াও ছিল প্রাণের ঝুঁকি। দ্রুত যাওয়া-আসা করতে হতো। এভাবে বাজারে যাওয়ার সময় তাঁর দুই প্রতিবেশী নিহত হন।
আবদোর আশঙ্কা, হুতিরা আবার কখনো এডেনে পৌঁছে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গে এ নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করেন তিনি।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২১ সালের শেষ নাগাদ ইয়েমেনের সংঘাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষের পর্যাপ্ত খাবার নেই। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৫ লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু ইয়েমেনের ইতিহাস সব সময় এমন ছিল না।

একসময় যে দেশকে বলা হতো সুখের আরব
হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বসতি থাকা ইয়েমেন প্রাচীনকালে ‘আরাবিয়া ফেলিক্স’ বা ‘সুখের আরব’ নামে পরিচিত ছিল। একসময় এখানে গড়ে উঠেছিল বিশ্বের শক্তিশালী কয়েকটি রাজ্য। লোককথা ও ঐতিহাসিক কিংবদন্তিতে দেশটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে গিলগামেশের অমরত্বের সন্ধান, যিশুর জন্মের সময় জ্ঞানী ব্যক্তিদের বহন করা ধূপ ও গন্ধরস এবং শেবার রানির কাহিনি।
আজ সেই দেশেই অসংখ্য মানুষ চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন আবদো। তাঁর কাজের অংশ হিসেবে তাঁকে এডেনের আশপাশে গড়ে ওঠা অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে যেতে হয়। সেখানে দেখা পরিস্থিতি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে।
তিনি বলেন, অনেক পরিবারকে শুধু একটি প্লাস্টিকের চাদরের নিচে বসবাস করতে হয়। একবার তিনি এমন এক নারীর দেখা পান, যার সদ্যোজাত সন্তান অসুস্থ ছিল। মা ও শিশুটির কাছে কিছুই ছিল না। শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে নারীটি জানান, সন্তান বাঁচল কি মরল, তা নিয়েও তাঁর আর কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, এই জীবনে তাঁর বা সন্তানের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট নেই বলে তিনি মনে করছিলেন।
প্রতিশোধের চক্র ও রাজনৈতিক বিভাজন
ইয়েমেনে নানা ধরনের সংঘাত দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে থাকে, তারা সব সময় দেশের অন্য অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দেশটি কেবল একটি জাতিরাষ্ট্র নয়; এখানে প্রায় ২০০টি গোত্র রয়েছে, যেগুলো চারটি প্রধান গোত্রীয় জোটে বিভক্ত। অনেক ইয়েমেনির কাছে জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে গোত্রীয় আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল এবং লোহিত সাগরসংলগ্ন তিহামা উপকূলে গোত্রীয় কাঠামো সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব নির্ধারিত এলাকা রয়েছে। গোত্রগুলোর মধ্যে সাময়িক জোট গড়ে উঠলেও পারস্পরিক সংঘাত অস্বাভাবিক নয়। এসব সমাজে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি বেশ শক্তিশালী।
এক গোত্রের কেউ অন্য গোত্রের কাউকে হত্যা করলে অনেক সময় অপরাধীর গোত্রের সব সদস্যকেই দায়ী করা হয়। অস্ত্রের সহজলভ্যতার কারণে এ ধরনের বিরোধ দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর যুদ্ধ গোত্রভিত্তিক বিরোধের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক।
২০১০-এর দশকের শুরুতে আরব বসন্তের প্রতিবাদ মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে ইয়েমেনেও বিভিন্ন শ্রেণি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ দীর্ঘদিনের শাসক আলি আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে বিভিন্নভাবে দেশটির নেতৃত্বে থাকা সালেহ ছিলেন দীর্ঘকালীন শাসক ও স্বৈরাচারী নেতা। বিক্ষোভ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে তিনি ক্ষমতা হারান।
সালেহর সাবেক উপপ্রধান আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এদিকে নিজেদের জায়েদি শিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকাররক্ষার দাবিদার সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী হুতিরা উত্তরাঞ্চলের সাদা শহর ও আশপাশের এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছিল।
২০১৪ সালে হুতিরা উত্তর দিক থেকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে রাজধানী সানা এবং উত্তর ও পশ্চিম ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করে।
সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। হুতিরা নিয়ন্ত্রণ করছে উত্তর ও পশ্চিমের প্রায় পুরো পার্বত্য এবং তুলনামূলক উর্বর অঞ্চল, যেখানে দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাস করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে এডেনসহ দক্ষিণ ও পূর্বের বিস্তীর্ণ, তুলনামূলক কম জনবসতিপূর্ণ মরুভূমিপ্রধান এলাকা।
হুতিদের সানা দখলের পর প্রতিবেশী দেশগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সৌদি আরব। নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তে ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারে উদ্বিগ্ন হয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সালে সানা এবং হুতিদের অন্যান্য শক্ত ঘাঁটিতে হামলা শুরু করে।

এই অভিযানকে স্বল্পমেয়াদি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল হুতিদের বড় ধরনের আঘাত দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে আবার সানায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় পরও সৌদি আরব এই সংঘাতের জটিলতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
খাবার আছে, কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই
গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা ইয়েমেনের বড় সমস্যা হলেও সংকটের তালিকা সেখানেই শেষ নয়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মুখে রয়েছে।
এর কারণ এই নয় যে ইয়েমেনের মাটিতে ফসল জন্মায় না। দেশটির পার্বত্য মধ্যাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে আরব উপদ্বীপের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত।
আবদোর ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের বড় শহর ও নগরগুলোর বাজারে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছে তা কেনার মতো অর্থ নেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীকে বেতন পেতে কখনো কখনো তিন থেকে চার মাস অপেক্ষা করতে হয়। ফলে নিয়মিত খাবার কেনাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এমনকি সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও সময়মতো বেতন পান না। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে তিনি শুনেছেন। এর ফলে অনেক পরিবারকে প্রতিদিনের খাবারের সংখ্যা কমাতে হয়েছে।
অনেক মানুষ দিনে মাত্র একবার অল্প খাবার খেয়ে থাকেন। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন, বিশেষ করে যুদ্ধের সম্মুখসারির কাছাকাছি। সেখানে অনেক বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও বিক্রির মতো খাবার নেই, আবার কোথাও নিরাপদে বাজারে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
শেবার রানি ও এক গ্লাস পানির মূল্য

ইয়েমেনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোককথার সঙ্গে যুক্ত কিংবদন্তিগুলোর মধ্যে শেবার রানির গল্প বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রকৃত নাম জানা যায় না। এমনকি তিনি আদৌ ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কি না, তা নিয়েও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ধারণা করা হয়, তাঁর রাজধানী ছিল বর্তমান ইয়েমেনের মারিব এলাকায়—মরুভূমির ধুলোময় একটি শহর, যা বর্তমানে সংঘাতের সম্মুখসারির কাছাকাছি। ইথিওপিয়ার আকসুমকেও তাঁর রাজধানী হিসেবে দাবি করা হয়।
কিংবদন্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়, শেবার রানি জেরুজালেমে রাজা সলোমনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সলোমন তাঁকে শর্ত দিয়েছিলেন, তাঁর কোনো কিছু নেওয়া যাবে না। রানির জন্য বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়। কিন্তু সলোমন তাঁর রাঁধুনিদের খাবারে অতিরিক্ত লবণ মেশাতে বলেন।
মাঝরাতে প্রচণ্ড তৃষ্ণায় রানির ঘুম ভেঙে যায়। তিনি পানি পান করতেই সলোমন তাঁকে প্রতিশ্রুতি ভাঙার অভিযোগ করেন। রানি বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘কিন্তু এটা তো শুধু পানি!’
সলোমন উত্তর দেন, ‘পৃথিবীতে পানির চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই।’
ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কথার তাৎপর্য গভীর। খাদ্যসংকটের সঙ্গে দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী পানির সংকটও যুক্ত হয়েছে।
আবদো বলেন, এডেনসহ ইয়েমেনের সর্বত্র পানির অভাব বড় সমস্যা। শহরের প্রধান পানির ট্যাংক তাঁর বাড়ির কাছেই, অথচ তাঁদের বাড়িতে প্রায়ই সরবরাহের পানি আসে না। এডেনের পুরোনো কেন্দ্র ক্রেটারে পরিস্থিতি আরও খারাপ।
বছরে সাধারণত মাত্র ১০৮ থেকে ১১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় ইয়েমেনে। স্থায়ী নদী নেই, ভূগর্ভস্থ পানির মজুত কমছে এবং পানির অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণও দুর্বল। সব মিলিয়ে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে পানিসংকটাপন্ন দেশগুলোর একটি।
বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইয়েমেনে জনপ্রতি নবায়নযোগ্য অভ্যন্তরীণ মিঠাপানির সম্পদ ছিল মাত্র প্রায় ৫৫ ঘনমিটার। বিশ্বে এর গড় পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৪০০ ঘনমিটার। সবচেয়ে সংকটাপন্ন শহরগুলোর একটি সানায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর ছয় থেকে আট মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে ভূগর্ভে প্রায় ৩০ মিটার গভীরতায় পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে কিছু এলাকায় সেই গভীরতা বেড়ে ১ হাজার ২০০ মিটারে পৌঁছেছে।
এখন অনেক শহর ও জনপদ অন্য এলাকা থেকে ট্যাংকারে আনা পানির ওপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। কিন্তু এর দাম এত বেশি যে বহু পরিবারের পক্ষে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি কেনা সম্ভব হয় না।
পানির সংকট সংঘাতও বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ইয়েমেনের গ্রামীণ এলাকার সংঘাতের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের সঙ্গে পানিসম্পদ নিয়ে বিরোধের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে পানির অবকাঠামোর ক্ষতি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই একমাত্র কারণ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশটির পানি ব্যবস্থাপনার ওপর আরও একটি বড় চাপ তৈরি করেছে খাত নামের উদ্ভিদ।

খাত: একটি উদ্ভিদ, যা বাড়াচ্ছে সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট
ইয়েমেনের পাশাপাশি সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়া ও কেনিয়ার কিছু অঞ্চলে খাত চিবানোর প্রচলন রয়েছে। এটি ‘খাত’, ‘চ্যাট’ বা ‘মিরা’ নামেও পরিচিত। Catha edulis বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত এই উদ্ভিদটি দেখতে সাধারণ ঝোপের মতো। এটি ইয়েমেনের উঁচু ভূমি এবং পূর্ব আফ্রিকার কিছু এলাকায় জন্মায়।
খাতের পাতা মুখে নিয়ে ধীরে ধীরে চিবানো হয়। একসময় মুখের এক পাশে এত পাতা জমে যে ব্যবহারকারীর গাল ফুলে ওঠে। ব্যবহারকারীদের দাবি, খাত চিবালে হালকা উত্তেজনা তৈরি হয়, কথাবার্তায় আগ্রহ বাড়ে, ক্লান্তি কমে এবং ক্ষুধা দমিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাতকে এমন একটি মাদকদ্রব্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যা হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার মানসিক নির্ভরতা তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশসহ বিশ্বের অনেক জায়গায় এটি নিয়ন্ত্রিত পদার্থ। তবে ইয়েমেনের বহু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে খাত চিবানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অভ্যাস।
আনুমানিক ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ইয়েমেনি পুরুষ এবং ৫০ থেকে ৭৩ শতাংশ নারী বিকেলের বেশ কয়েক ঘণ্টা খাত চিবিয়ে কাটান। সাধারণত বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বসে এটি খাওয়া হয়। এ ধরনের আড্ডার স্থানকে বলা হয় ‘মাফরাজ’—প্রথাগত বাড়ির ওপরের তলায় অবস্থিত, সাধারণত খোলামেলা দৃশ্যযুক্ত একটি নিরিবিলি ঘর।
অভ্যাসটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও খাতের গুরুতর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, কর্মক্ষম সময়ের এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত খাত চিবানোর পেছনে ব্যয় হতে পারে। ভোক্তারা তাঁদের আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ এই অভ্যাসে খরচ করেন।
শুষ্ক ইয়েমেনে খাত চাষের জন্য প্রচুর পানি প্রয়োজন। অন্য ফসলের জমি কমিয়ে এর চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে এটি দেশটির সবচেয়ে বেশি চাষ করা অর্থকরী ফসল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে খাতের চাষ বেড়েছে ৪০ শতাংশ। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পানির চাহিদাও।
সমস্যা হলো, মানুষের চাহিদা ও কৃষিকাজ—দুটির জন্য পর্যাপ্ত পানি ইয়েমেনের নেই।
ধ্বংসের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার সুযোগ
যুদ্ধ, ক্ষুধা, পানির অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে ইয়েমেনে স্বাভাবিক জীবন কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু আবদোর অভিজ্ঞতা বলছে, এত দুর্ভোগের মধ্যেও আনন্দের কিছু মুহূর্ত মানুষের জীবনে রয়ে গেছে।
তাঁর দুই মেয়ের বয়স পাঁচ ও দুই বছর। কখনো স্ত্রীকে নিয়ে সন্তানদের এডেন মলে ঘুরতে যান। সেখানে শিশুদের খেলার জায়গায় সময় কাটান, বিভিন্ন রাইডে চড়েন এবং কোনো রেস্তোরাঁ বা ক্যাফেতে খাবার খান।
আবদোর বর্ণনায় ইয়েমেনের এমন এক চিত্র ফুটে ওঠে, যা যুদ্ধের খবরের বাইরে খুব কমই দেখা যায়।
কখনো তাঁরা সমুদ্রের কাছে গিয়ে ফুটবল খেলেন এবং পিকনিক করেন। আবদো বলেন, তিনি ফুটবল খেলায় খুব ভালো নন। তবে মেয়েদের সঙ্গেই খেলেন, আর মেয়েরা তা জানে না।
তাঁদের বাড়ির কাছেও কয়েকটি সৈকত রয়েছে। অন্য সময় তাঁরা গোল্ড মোহর সৈকতে যান। সেখানে অনেক পরিবার বেড়াতে আসে। মানুষ সাঁতার কাটে, সমুদ্রতীরের হাঁটার পথ ধরে ঘোরে। সেই পথে বসার বেঞ্চ, শিশুদের খেলার মাঠ এবং আইসক্রিম কেনার দোকান রয়েছে।
আবদোর কাছে এসব ছোটখাটো অভিজ্ঞতাও পরিবারের জন্য একটি সুন্দর দিন কাটানোর সুযোগ।

ইউরোপে নিজের তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ জীবনে ফিরে যাওয়ার আগে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর আশা কী। কোনো দ্বিধা ছাড়াই তিনি বলেন, তাঁর একমাত্র চাওয়া, মেয়েরা যেন শান্তিপূর্ণ ইয়েমেনে বড় হতে পারে। দেশটিতে যেন উন্নয়ন ঘটে, ভালো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
তাঁর কথায়, ‘আমি শুধু চাই, তারা যেন কাজ করার এবং স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়।’
এই আকাঙ্ক্ষা শুধু একজন বাবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়। দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত একটি দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ প্রত্যাশারও প্রতিফলন।
সময়ের ধারায় ইয়েমেনের ইতিহাস
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ
মারিবকে কেন্দ্র করে সাবা রাজ্যের বিকাশ ঘটে। সেচব্যবস্থা নির্মাণ এবং ধূপের বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজ্যটি সমৃদ্ধ হয়। আরব উপদ্বীপের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব আফ্রিকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
১৮৩৯
ব্রিটেন এডেন দখল করে এবং ভারতগামী নৌপথে বন্দরটিকে নৌঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ইয়েমেনে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তৃত হয়।
১৯১৮
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর ইয়েমেনে অটোমান শাসনের অবসান ঘটে। উত্তরাঞ্চল স্বাধীনতা লাভ করে, অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের কিছু ভূখণ্ড ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।
১৯৬২
সেনা কর্মকর্তারা উত্তর ইয়েমেনের রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন। এর পর মিসর-সমর্থিত প্রজাতন্ত্রপন্থী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত রাজতন্ত্রপন্থীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
১৯৬৭
স্বাধীনতার আন্দোলনের পর ব্রিটেন ইয়েমেন থেকে সরে যায়। ৩০ নভেম্বর দক্ষিণ ইয়েমেন স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যার রাজধানী ছিল এডেন। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণে দুটি পৃথক ইয়েমেনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৯০–৯৪
১৯৯০ সালের ২২ মে আলি আবদুল্লাহ সালেহর নেতৃত্বে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হয়। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রচেষ্টা পরাজিত হয়।
২০১১–১২
আরব বসন্তের বিক্ষোভ সালেহর শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে। সমঝোতার ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় তিনি তাঁর উপপ্রধান আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন।
২০১৪–১৫
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতিরা সানা দখল করে এবং দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। ২০১৫ সালের মার্চে হাদি সরকারের সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে।
২০২২
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে সংঘর্ষ ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি কমে। তবে অক্টোবরে স্থায়ী শান্তিচুক্তি ছাড়াই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়।
২০২৩–২৪
লোহিত সাগরে হুতিদের হামলায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইয়েমেনে হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে।
সেপ্টেম্বর–অক্টোবর ২০২৬
সেপ্টেম্বরে হুতিরা মোখা দখল করে। অক্টোবরের শুরুতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তায় সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

স্থাপত্য ও ইউনেসকোর ঐতিহ্য
সানা বিশ্বের প্রাচীনতম জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। শহরটির পুরোনো অংশ ১৯৮৬ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সেখানে আঁকাবাঁকা সরু গলি, বাজার, প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ এবং পোড়া লাল ইট ও চাপ দিয়ে বসানো মাটির তৈরি বহুতল বাড়ি রয়েছে। এসব বাড়ির রঙিন কাচের জানালা এবং সাদা জিপসামের অলংকরণ ও নকশা বিশেষভাবে পরিচিত।
দুঃখজনকভাবে, যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণে সানার পুরোনো শহরের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অবহেলাও ক্ষয়ক্ষতির বড় কারণ। প্রবল বর্ষণে মাটির ইটের তৈরি ভবন ধসে পড়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া বহু পরিবার নিজেদের বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি এবং পুরোনো সানার ঐতিহ্য সংরক্ষণে হুতিদের সীমিত আগ্রহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ইয়েমেনের স্থাপত্য ঐতিহ্য শুধু সানায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় পাথরের তৈরি গ্রামগুলো প্রায়ই খাড়া পাহাড়ের কিনারায় গড়ে তোলা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রাম খাদের দেয়াল আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতে শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়েই এসব বসতি নির্মাণ করা হতো।
পূর্ব ইয়েমেনে হাদরামাউত মালভূমির শুষ্ক ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে উর্বর ওয়াদি হাদরামাউত উপত্যকা। শতাব্দীপ্রাচীন গ্রাম ও শহরঘেরা এই উপত্যকাতেই অবস্থিত শিবাম। প্রাচীরবেষ্টিত এই ঐতিহাসিক শহরে প্রায় ৫০০টি সাত থেকে আটতলা মাটির ইটের ভবন রয়েছে। দেখতে অনেকটা আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের মতো হওয়ায় এগুলো বিশেষভাবে পরিচিত।
১৯৮২ সালে শিবামকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের অভাবে শহরটি এখন বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকট দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবু আবদোর মতো মানুষের কাছে ভবিষ্যতের আশা এখনো নিভে যায়নি। তাঁদের স্বপ্ন খুব সাধারণ—সন্তানদের নিরাপদ জীবন, ভালো শিক্ষা, কাজের সুযোগ এবং যুদ্ধমুক্ত একটি দেশ। সেই স্বপ্নই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও ইয়েমেনের মানুষের বেঁচে থাকার প্রেরণা হয়ে আছে।












