মাটি, গাছের ছাল, ঘাস কিংবা শ্যাওলা স্পর্শ করা আমাদের কাছে খুব সাধারণ একটি কাজ। কিন্তু প্রকৃতির এসব উপাদানের সংস্পর্শ ত্বকের উপকারী জীবাণুর বৈচিত্র্য বাড়াতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাটিতে হাত দেওয়া, গাছ লাগানো কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশে নিয়মিত সময় কাটানোর মতো সাধারণ অভ্যাসের সঙ্গে ত্বকের জীবাণুসমাজ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।
আমাদের ত্বকে অসংখ্য অণুজীব বসবাস করে। এদের মধ্যে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য অণুজীব ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ত্বকে থাকা এসব অণুজীবের বৈচিত্র্য বেশি হলে ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ কমতে পারে। ফলে ত্বকের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রাকৃতিক উপাদানের সংস্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
ফিনিশ এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিবেশবিদ ও প্রকৃতি-স্বাস্থ্য গবেষক মিরা গ্রোনরোসের একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ২০ সেকেন্ড ধরে মাটি, পিট ও শ্যাওলা দিয়ে হাত ঘষতে বলা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, এরপর তাঁদের ত্বকে থাকা অণুজীবের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য বেড়ে যায়। এমনকি কলের পানিতে হাত ধুয়ে নেওয়ার পরও এই পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাইরে থেকে হাত পরিষ্কার দেখালেও ত্বকের অণুজীবসমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এই প্রভাব স্থায়ী নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু সময়ের মধ্যেই ত্বকের অণুজীবসমাজ আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে যেতে পারে। তাই একবার মাটি ছোঁয়ার পরিবর্তে প্রকৃতির সংস্পর্শে নিয়মিত থাকার সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
শিশুদের কাদামাটিতে খেলায় কী উপকার?
ফিনল্যান্ডের একটি শিশুযত্নকেন্দ্রে শিশুদের প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে তারা গাছপালার মধ্যে দৌড়ায়, দড়ি বেয়ে ওঠে, বালু দিয়ে ঘর বানায়, পানিতে খেলে এবং মাটি ও কাঠের টুকরো নিয়ে নাড়াচাড়া করে। দিনের শেষে তাদের পোশাকে কাদা লাগা কিংবা হাত-পা ময়লা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
এই ধরনের পরিবেশ শিশুদের স্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলে, তা জানতে গবেষকেরা তাদের ত্বক, লালা ও মলের নমুনা পরীক্ষা করছেন। পাশাপাশি রক্ত ও চুলের নমুনা বিশ্লেষণ করে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফিনল্যান্ডের ৪৩টি শিশুযত্নকেন্দ্রকে যুক্ত করে পরিচালিত ভাহভিস্তু গবেষণা প্রকল্পে এ ধরনের পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে পরিবেশবিজ্ঞানী মারজা রোসলুন্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় শিশুযত্নকেন্দ্রের পাকা উঠানের পরিবর্তে বনভূমির মাটি, পিট ও গাছ লাগানোর বাক্স ব্যবহার করা হয়। শিশুরা সেখানে নিয়মিত খেলার ২৮ দিন পর তাদের ত্বক, লালা ও অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করা হয়। এক বছর পরও তাদের ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য তুলনামূলক বেশি থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, ত্বকে বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য কমাতে পারে। একটি বৈচিত্র্যময় অণুজীবসমাজে বিভিন্ন জীবাণু নিজেদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। ফলে রোগ সৃষ্টিকারী কিছু জীবাণুর বংশবিস্তারের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
রোসলুন্ডের ভাষায়, সুস্থ ত্বককে এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে বিভিন্ন উপাদান ভারসাম্য বজায় রেখে সহাবস্থান করে। বিপরীতে, ক্ষতিকর জীবাণুর আধিপত্য সেই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
সুস্থ ত্বকের সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সম্পর্ক
ত্বকের স্বাস্থ্য শুধু বাইরের সুরক্ষার বিষয় নয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকেরা এখন অনুসন্ধান করছেন, ত্বকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি কীভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
একটি পরীক্ষায় শিশুদের দুই দলে ভাগ করে আলাদা ধরনের বালুর বাক্সে খেলতে দেওয়া হয়। এক দলের বাক্সে ছিল বিভিন্ন ধরনের অণুজীবে সমৃদ্ধ মাটি। অন্য দলের বাক্সে দেখতে একই রকম হলেও অণুজীবের বৈচিত্র্য ছিল কম।
পরীক্ষায় দেখা যায়, অণুজীবে সমৃদ্ধ মাটিতে খেলা শিশুদের ত্বকে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে। পাশাপাশি তাদের রক্তে সাইটোকাইন নামের কিছু রোগ প্রতিরোধ-সংশ্লিষ্ট উপাদানের পরিবর্তন দেখা যায়। এসব পরিবর্তন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কাজ শুধু জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করা নয়; প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া শরীরের নিজের টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। তাই রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
এ গবেষণাগুলো প্রকৃতির জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার একটি ধারণাকে সমর্থন করে। একে বলা হয় জীববৈচিত্র্য অনুমান। এই ধারণা অনুযায়ী, পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি মানুষের শরীরের অণুজীবসমাজকে প্রভাবিত করতে পারে, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় গামাপ্রোটিওব্যাকটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্যের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক দেখা গেছে। বনভূমির মাটির সংস্পর্শে আসা শিশুদের ত্বকে এই ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছিল। একই সঙ্গে তাদের শরীরে নিয়ন্ত্রক টি-কোষের উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনও দেখা যায়। এই শ্বেত রক্তকণিকাগুলো রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের নিজের টিস্যুর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
তবে এসব পরিবর্তনের ফলে একজিমা, হাঁপানি কিংবা অ্যালার্জির মতো রোগের ঝুঁকি কতটা কমে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রকৃতির সংস্পর্শ এসব রোগ প্রতিরোধ করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণও নেই। গবেষকেরা মনে করছেন, এই সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
ঘরে গাছ লাগিয়েও মিলতে পারে উপকার
প্রকৃতির সম্ভাব্য উপকার পেতে শিশুদের মতো কাদামাটিতে খেলতে হবে, এমন নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও গাছ লাগানো ও মাটির সংস্পর্শে থাকার ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
একটি গবেষণায় শীতকালে প্রাপ্তবয়স্কদের ঘরের ভেতরে সবজি চাষ করতে বলা হয়। তাঁদের একদল বিভিন্ন ধরনের অণুজীবে সমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করেন। অন্য দল ব্যবহার করেন দেখতে একই রকম, কিন্তু অণুজীবের বৈচিত্র্য কম এমন মাটি। এক মাস ধরে তাঁরা প্রতিদিন গাছের পরিচর্যা করেন এবং উৎপাদিত সবজি খান।
গবেষণায় দেখা যায়, অণুজীবে সমৃদ্ধ মাটি ব্যবহারকারীদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য বেড়েছে। তাঁদের রক্তে প্রদাহ কমাতে সহায়ক কিছু সাইটোকাইনের মাত্রাতেও পরিবর্তন দেখা যায়। অন্য দলের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি।
গবেষক মিরা গ্রোনরোসের মতে, ঘরে গাছ লাগানো প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার একটি সহজ ও সহজলভ্য উপায়। এ ধরনের সাধারণ অভ্যাসের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমে পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গবেষকদের কাছেও আগ্রহের বিষয়।
কর্মক্ষেত্রেও প্রকৃতির উপকারিতা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের কয়েকটি অফিসে জীবন্ত গাছ দিয়ে তৈরি সবুজ দেয়াল স্থাপন করে দুই সপ্তাহ পর কর্মীদের শরীরে পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এতে তাঁদের ত্বকে অণুজীবের বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি রক্তে প্রদাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখা কিছু সাইটোকাইনের মাত্রা কমার প্রমাণ পাওয়া যায়। ত্বকে ল্যাকটোব্যাসিলাস নামের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিও বেড়েছিল।
তবে এসব গবেষণার ফলাফলকে সব ধরনের পরিবেশ, সব বয়সের মানুষ কিংবা সব স্বাস্থ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার নির্দিষ্ট সময়, মাটির ধরন এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থার প্রভাব আরও বিশদভাবে বোঝা প্রয়োজন।
শহরেও প্রকৃতির সংস্পর্শ বাড়ানোর আহ্বান
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে শহর পরিকল্পনায়ও পরিবর্তনের কথা বলছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, পার্ক, সবুজ পথ, গাছপালা এবং প্রাকৃতিক উপাদানসমৃদ্ধ খেলার জায়গা এমনভাবে তৈরি করা উচিত, যাতে মানুষকে আলাদা করে পরিকল্পনা না করেও দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার সুযোগ দেওয়া যায়।
কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গাছপালার মধ্য দিয়ে হাঁটা, স্কুলের আশপাশে সবুজ পরিবেশ তৈরি করা কিংবা আবাসিক এলাকায় বাগান রাখার মতো উদ্যোগ মানুষকে নিয়মিত প্রকৃতির কাছাকাছি রাখতে পারে।
গবেষক গ্রোনরোসের মতে, শিশুদের বাইরে খেলতে গিয়ে গাছের শঙ্কু, ছোট ডাল কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান সংগ্রহ করতে দেওয়া যেতে পারে। সেগুলো নিয়ে ঘরে খেললেও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের পরিচিতি বাড়ে।
এ ক্ষেত্রে অবশ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মাটি বা গাছপালা স্পর্শ করার পর হাত ধুয়ে নেওয়া উচিত। দূষিত মাটি, পশুর মল, ধারালো বস্তু কিংবা বিষাক্ত গাছপালা থেকে দূরে থাকতে হবে। ক্ষতযুক্ত ত্বকে মাটি লাগানো এড়ানো এবং ছোট শিশুদের মাটি মুখে দেওয়া থেকে বিরত রাখাও জরুরি।
গবেষকদের মতে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত বাগান করা, গাছপালা পরিচর্যা করা এবং বাইরে সময় কাটানো ত্বকের অণুজীবসমাজ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য উপকারী হতে পারে।
অর্থাৎ, সুস্থ থাকতে সব সময় জটিল কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন হয় না। নিরাপদ পরিবেশে ঘাসের ওপর বসা, গাছের ছাল স্পর্শ করা কিংবা ছোট একটি বাগানের পরিচর্যা করার মতো সাধারণ অভ্যাসও প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বাড়াতে পারে। তবে এগুলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা, টিকা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়।












