গত ২০০ বছরে মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে দীর্ঘায়ুর সঙ্গে বেড়েছে বয়সজনিত নানা রোগের ঝুঁকিও। এর মধ্যে ডিমেনশিয়া অন্যতম। বিজ্ঞানীরা এখন এমন উপায় খুঁজছেন, যার মাধ্যমে মস্তিষ্কের বার্ধক্য ধীর করা এবং ডিমেনশিয়ার সূত্রপাত যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ যথেষ্ট দীর্ঘায়ু হলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কি একসময় সবার ক্ষেত্রেই দেখা দিতে পারে, এমন একটি তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এটি এখনো প্রমাণিত নয়। গবেষকদের লক্ষ্য হলো, এমন কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে বের করা, যাতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি মানুষের আয়ুষ্কালের বাইরেও পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
এ ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসার পদ্ধতি আরও নির্ভুল করাই লক্ষ্য নয়। কোনো পদক্ষেপ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটি পরিমাপ করার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে চান বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের সুস্থতা ধরে রাখতে জীবনযাপনের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা এবং মানসিকভাবে ভালো থাকার অভ্যাস বয়সের সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর পাশাপাশি রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা হলো ঘুম। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাসের স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াকার, যিনি ‘হোয়াই উই স্লিপ’ বইয়ের লেখক, ঘুমকে মস্তিষ্ক ও শরীরের সুস্থতা পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর দৈনন্দিন প্রক্রিয়াগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, চিন্তাশক্তি ও মানসিক কার্যক্রমকে উন্নত করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ঘুমের ঘাটতি এসব সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে ঘুমের গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কে বর্জ্য অপসারণের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে। এ সময় বিটা অ্যামাইলয়েড ও টাউ নামের দুটি প্রোটিন অপসারণে সহায়তা করে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পরিষ্কারব্যবস্থা। এই প্রোটিনগুলোর অস্বাভাবিক জমা আলঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুমের ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়ছে।
ঘুমের ধরনেও পরিবর্তন ডিমেনশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অধ্যাপক ওয়াকারের মতে, এ ধরনের পরিবর্তন শুধু ষাট বা সত্তরের দশকে পৌঁছানোর পর দেখা দেয় না; ত্রিশের দশকেও এর সূচনা হতে পারে।
এ কারণে ঘুমের সময়, স্থায়িত্ব ও নিয়মিততার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা ভবিষ্যতে মধ্যবয়স থেকেই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর কৌশল তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। ঘুমের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকির প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
তবে ঘুমের পরিবর্তন দেখলেই ডিমেনশিয়া হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। একইভাবে, জীবনযাপনের অভ্যাস উন্নত করলেই এ রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। বরং পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, মানসিক সক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সামগ্রিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়াকে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষার সম্ভাবনাময় উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য তাই শুধু মানুষের আয়ু বাড়ানো নয়, বরং বয়স বাড়লেও মস্তিষ্ককে যতটা সম্ভব সুস্থ ও কার্যকর রাখা। জীবনযাপনের অভ্যাস এবং ঘুমের মতো দৈনন্দিন বিষয় কীভাবে এই লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে, তা বোঝার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতে পারে।












