নিয়মিত ব্যায়াম করা, হাঁটা কিংবা ভার তোলা শরীর সুস্থ রাখার পরিচিত উপায়। কিন্তু মেঝেতে বসে আবার উঠে দাঁড়াতে কতটা সহজ হয়, কিংবা হাতের সাহায্য ছাড়াই নিচু চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো যায় কি না, তা থেকেও শরীরের সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সাধারণ নড়াচড়ার সঙ্গে পেশির শক্তি, জয়েন্টের নমনীয়তা, ভারসাম্য এবং শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সক্ষমতা ধরে রাখা সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি চারজনের একজনের বেশি প্রতিবছর পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এই বয়সীদের আঘাতজনিত মৃত্যু ও গুরুতর জখমের অন্যতম প্রধান কারণ পড়ে যাওয়া। তাই দৈনন্দিন জীবনে নিরাপদে বসা, ওঠা এবং শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করার সক্ষমতা বজায় রাখা শুধু ব্যায়ামের বিষয় নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাধারণ নড়াচড়ায় শরীরের সক্ষমতা বোঝা যায়
জিমে ভার তোলা কিংবা কয়েক কিলোমিটার হাঁটার মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু সক্ষমতা যাচাই করা যায়। কিন্তু মেঝেতে বসা, সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো কিংবা হাতের সাহায্য ছাড়াই চেয়ার থেকে ওঠার মতো কাজে শরীরের একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে। এ সময় পেশির শক্তির পাশাপাশি জয়েন্টের নড়াচড়া, স্নায়ুতন্ত্রের সমন্বয় এবং ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতাও প্রয়োজন হয়।
চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় শরীরকে প্রথমে সামনের দিকে ঝুঁকতে হয়। এরপর পায়ের ওপর ভর দিয়ে শরীরের ওজন ওপরে তুলতে হয় এবং দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। এ জন্য গোড়ালি ও নিতম্বের যথেষ্ট নমনীয়তা, কোমর ও পায়ের পেশির শক্তি এবং শরীরের মধ্যভাগের পেশির নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
এই কাজের জন্য শরীরের একাধিক সক্ষমতা একসঙ্গে দরকার হওয়ায় চিকিৎসকেরা শারীরিক দুর্বলতা বা দৈনন্দিন কাজ করার সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নে চেয়ার থেকে ওঠা-বসার পরীক্ষা ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের বয়স্কদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও ৩০ সেকেন্ডে কতবার চেয়ার থেকে ওঠা-বসা করা যায়, তা যাচাই করার পরীক্ষা রয়েছে।
মেঝেতে বসা ও উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক
মেঝেতে বসে আবার উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৪৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী চার হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্কের ওপর এ বিষয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষকেরা দেখতে চেয়েছিলেন, মেঝেতে বসা ও সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতার সঙ্গে স্বাভাবিক কারণে এবং হৃদ্রোগজনিত কারণে মৃত্যুর ঝুঁকির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।
পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বসার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ এবং উঠে দাঁড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বর দেওয়া হয়। ভারসাম্য হারালে কিংবা হাত, হাঁটু, বাহু বা পায়ের পাশের অংশের সাহায্য নিতে হলে নম্বর কাটা হতো। কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই স্থিরভাবে বসতে ও উঠে দাঁড়াতে পারলে পাওয়া যেত পূর্ণ ১০ নম্বর।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গড়ে নয়, বরং মধ্যম অনুসরণকাল ছিল ১২ দশমিক ৩ বছর। এ সময়ে দেখা যায়, যাঁরা পরীক্ষায় শূন্য থেকে চার নম্বর পেয়েছিলেন, তাঁদের স্বাভাবিক কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি পূর্ণ ১০ নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় চার গুণ ছিল। হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল প্রায় ছয় গুণ।
তবে এই ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে, মেঝেতে বসতে বা উঠতে অসুবিধা হলেই কারও আয়ু কম হবে। গবেষণাটি মূলত শারীরিক সক্ষমতা ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেছে। বয়স, আগে থেকে থাকা অসুস্থতা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থাও এ ধরনের ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই পরীক্ষাটিকে এককভাবে আয়ু নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বয়স বাড়লেই চলাফেরার সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে হবে না
অনেকেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে বসা কিংবা সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর অসুবিধাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। কিন্তু এসব সক্ষমতা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধরে রাখা বা উন্নত করা সম্ভব হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী নিরাপদভাবে শুরু করা এবং ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাত্রা বাড়ানো।
শুধু বেশি ওজন তোলা বা দীর্ঘ সময় হাঁটার ওপর নির্ভর না করে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় নড়াচড়াগুলোও ব্যায়ামের অংশ করা উচিত। নিচে এ ধরনের তিনটি অনুশীলন তুলে ধরা হলো।
তবে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো, বিশেষ করে যাঁদের ভারসাম্যের সমস্যা, জয়েন্টে ব্যথা, সাম্প্রতিক আঘাত কিংবা পড়ে যাওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
১. চেয়ার থেকে ওঠা-বসার অনুশীলন
শক্ত ও স্থির একটি চেয়ার নিয়ে তার সামনের দিকে বসুন। দুই পা নিতম্বের সমান দূরত্বে রাখুন। এরপর নিতম্ব থেকে শরীর সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। নিরাপদ হলে হাতের সাহায্য নেবেন না। দাঁড়ানোর পর কিছুক্ষণ স্থির থাকুন। এরপর নিতম্ব পেছনের দিকে নিয়ে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে চেয়ারে বসুন।
শুরুতে হাতের সাহায্য ছাড়া দাঁড়ানো কঠিন হলে সামনে একটি স্থির টেবিল বা কাউন্টার কিংবা চেয়ারের পিঠ ধরে অনুশীলন করা যেতে পারে। সক্ষমতা বাড়লে ধীরে ধীরে হাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
আরও কঠিন করতে চাইলে এক পায়ে শরীরের ভার রেখে বসা ও দাঁড়ানোর অনুশীলন করা যায়। তবে ভারসাম্যের জন্য সামনে শক্ত কোনো অবলম্বন রাখা জরুরি। যাঁদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের এক পায়ে ভর দিয়ে এই অনুশীলন করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিবার পাঁচ থেকে দশবার অনুশীলন করা যেতে পারে।
এই অনুশীলনে পা, নিতম্ব ও শরীরের মধ্যভাগের পেশি কাজ করে। একই সঙ্গে দাঁড়ানো ও বসার সময় ভারসাম্য এবং শরীরের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের দক্ষতাও বাড়ে।
২. মেঝে থেকে ওঠার প্রাথমিক অনুশীলন
মেঝেতে বসা এবং সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানো কঠিন মনে হলে প্রথমে সহায়তা নিয়ে কয়েকটি ধাপে অনুশীলন করা যায়। এ জন্য পাশে একটি শক্ত ও স্থির চেয়ার রাখুন। প্রয়োজনে কাছাকাছি আরেকজনের সহায়তাও নিন।
প্রথমে চেয়ারের আসনে বাঁ হাত রেখে ডান হাঁটু মেঝেতে নামিয়ে এক হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থানে আসুন। এরপর বাঁ হাঁটুও নামিয়ে দুই হাত মেঝেতে রাখুন। এভাবে দুই হাত ও দুই হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে থাকুন। তারপর শরীরের ভার ডান নিতম্বের দিকে সরিয়ে ধীরে ধীরে মেঝেতে বসুন।
আবার উঠে দাঁড়ানোর সময় উল্টো ধাপ অনুসরণ করুন। প্রথমে দুই হাত ও দুই হাঁটুর ওপর ভর দিন। এরপর দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে শরীর সোজা করুন। তারপর এক পা সামনে এনে হাঁটু ভাঁজ করা অবস্থানে আসুন। চেয়ারের সাহায্য নিয়ে ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে যান।
প্রতিবার ওঠা ও নামার সময় তাড়াহুড়া না করে শরীরের ভার কোথায় যাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। দুই পাশ থেকেই তিন থেকে পাঁচবার অনুশীলন করা যেতে পারে।
এই অনুশীলনে নিতম্ব ও পায়ের পেশির শক্তি, জয়েন্টের নমনীয়তা, ভারসাম্য এবং শরীরের বিভিন্ন অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ে। চেয়ারের সাহায্য নেওয়ার কারণে শুরুতে শরীরের ওপর চাপও তুলনামূলক কম রাখা সম্ভব হয়। সক্ষমতা বাড়লে ধীরে ধীরে সহায়তা কমানো যেতে পারে।
৩. মেঝেতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ানোর উন্নত অনুশীলন
যাঁদের ভারসাম্য ও পেশির শক্তি ভালো, তাঁরা মেঝেতে পা আড়াআড়ি করে বসে অনুশীলন শুরু করতে পারেন। বসা অবস্থায় দুই হাঁটু তুলুন এবং পা দুটিকে কাছাকাছি এনে এমনভাবে রাখুন, যাতে দুই পায়ের তলা মেঝেতে থাকে এবং পা আড়াআড়ি অবস্থায় থাকে।
এরপর শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পায়ের ওপর ভর দিন। শরীরের মধ্যভাগ ও নিতম্বের পেশি ব্যবহার করে হাতের সাহায্য ছাড়াই দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। তারপর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আবার মেঝেতে বসুন। এভাবে তিন থেকে পাঁচবার অনুশীলন করা যেতে পারে, যদি তা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যকর হয়।
এই পদ্ধতি কঠিন মনে হলে শক্ত কোনো অবলম্বনের সঙ্গে ব্যায়ামের জন্য ব্যবহৃত প্রতিরোধক ফিতা লাগিয়ে সেটি ধরে ওঠা-নামা করা যেতে পারে। মেঝেতে বসার উচ্চতা সামান্য বাড়াতে একটি শক্ত ও স্থির উঁচু আসন বা ভাঁজ করা কম্বল ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যবহৃত অবলম্বন যেন পিছলে না যায় বা উল্টে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সক্ষমতা বাড়লে পা আড়াআড়ি না রেখে দুই পা পাশাপাশি রেখেও অনুশীলন করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে পাঁচ থেকে দশবার করার লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে সঠিক কৌশল ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
মেঝেতে বসে কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই উঠে দাঁড়াতে পারা গবেষণায় ব্যবহৃত বসা-ওঠার পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু এই অনুশীলন সবার জন্য উপযুক্ত নয়। হাঁটু বা নিতম্বে ব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে জোর করে চেষ্টা করা উচিত নয়।
শুধু জিমের ব্যায়াম নয়, প্রয়োজন দৈনন্দিন জীবনের প্রস্তুতি
শারীরিক সুস্থতা বলতে শুধু কতটা ভার তোলা যায় বা কত দূর হাঁটা সম্ভব, তা বোঝায় না। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় কাজগুলো নিরাপদে করার মতো শক্তি, নমনীয়তা, ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণও সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চেয়ার থেকে ওঠা, মেঝেতে বসা কিংবা আবার দাঁড়ানো আগের তুলনায় কঠিন হয়ে গেলে এসব কাজ পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সমস্যার সমাধান নয়। বরং নিরাপদ পদ্ধতিতে অনুশীলন করে সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্যে উপযুক্ত ব্যায়াম নির্বাচন করা যেতে পারে।
দৈনন্দিন নড়াচড়ার দক্ষতা ধরে রাখার সুফল শুধু বৃদ্ধ বয়সেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যবয়স থেকেই এসব অনুশীলনের অভ্যাস গড়ে তুললে ভবিষ্যতে নিজের কাজ নিজে করার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে কোনো ব্যায়ামই পড়ে যাওয়া বা অসুস্থতার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ হলো, শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী নিরাপদে শুরু করা, নিয়মিত অনুশীলন করা এবং ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগোনো। কারণ সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচার প্রস্তুতি শুধু জিমে নয়, প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলো কীভাবে করা হচ্ছে, তার মধ্যেও নিহিত।












