বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশ ভ্যাটিকান এবার নিজেদের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। প্রায় ১০ কোটি ইউরো ব্যয়ে তৈরি হতে যাওয়া এই প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিকাজও চলবে।
৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য
রোমের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভ্যাটিকানের মালিকানাধীন সান্তা মারিয়া দি গালেরিয়া এলাকায় এই সৌর-কৃষি প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির উৎপাদনক্ষমতা হতে পারে ৮০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট। এটি ইতালির অন্যতম বড় সৌর-কৃষি স্থাপনা হয়ে উঠতে পারে।
এই ব্যবস্থায় মাটির কয়েক মিটার ওপরে সৌর প্যানেল বসানো হবে। ফলে নিচের জমিতে কৃষিকাজ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্যানেলের ছায়া মাটির পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া কমাবে এবং অতিরিক্ত গরম বা খারাপ আবহাওয়া থেকে ফসলকে কিছুটা সুরক্ষা দেবে।
দুই বছরের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা
প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে আনুমানিক ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্মাণকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে ইতালি ও ভ্যাটিকানের একটি যৌথ কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতালি এ বছরের শুরুতে ২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটি অনুমোদন করার পর প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়।
প্রকল্পটির নির্দিষ্ট ব্যয়, উৎপাদনক্ষমতা ও সময়সীমা নিয়ে বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি ইউরো ব্যয় হতে পারে।
ভ্যাটিকানকে করবে জ্বালানি স্বনির্ভর
সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রধান উদ্দেশ্য ভ্যাটিকান রেডিওর সম্প্রচারকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এবং ভ্যাটিকান নগররাষ্ট্রকে জ্বালানির দিক থেকে স্বনির্ভর করে তোলা।
উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ভ্যাটিকানের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য স্থাপনাতেও ব্যবহার করা হতে পারে। এর মধ্যে রোমের শিশুদের জন্য পরিচালিত বামবিনো জেসু হাসপাতালও রয়েছে।
সৌর প্যানেল বসানো হবে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে, যা সান্তা মারিয়া দি গালেরিয়া এলাকার মোট জমির প্রায় অর্ধেক।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যাবে ইতালিতে
প্রকল্প থেকে ভ্যাটিকানের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে সেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ইতালিতে সরবরাহ করা হবে। ইতালিতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে, ভ্যাটিকান এই সুবিধা পাবে না।
সৌর-কৃষি প্রকল্পটির ওপর ভ্যাটিকান রেডিওর স্থাপনাগুলোর মতো বিশেষ মর্যাদা প্রযোজ্য হবে। এর ফলে ইতালির কিছু কর ও সরকারি ফি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
পোপ ফ্রান্সিসের অগ্রাধিকার ছিল প্রকল্পটি
প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস এই প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈজ্ঞানিক মতৈক্যকে প্রকাশ্যে গ্রহণ করা প্রথম পোপ হিসেবে তিনি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ওপর জোর দিয়েছিলেন। বর্তমান পোপ লিও চতুর্দশও প্রকল্পটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
ভ্যাটিকান নগররাষ্ট্রের আয়তন মাত্র ১০৮ একর এবং সেখানে বসবাস করেন ৯০০ জনেরও কম মানুষ। কিন্তু এর বাইরে রোমের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৪৫০ হেক্টর আয়তনের সান্তা মারিয়া দি গালেরিয়া এলাকা ভ্যাটিকানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ১৯৫০-এর দশক থেকেই সেখানে ভ্যাটিকান রেডিওর সম্প্রচার অবকাঠামো রয়েছে।
আগেও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করেছে ভ্যাটিকান
সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভ্যাটিকানের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০০৮ সালে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের সময়ে জার্মানির দুটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাটিকানকে ২ হাজার ৪০০টি সৌর প্যানেল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়েছিল। এগুলো পোপের জনসম্মুখে সাক্ষাৎ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত নার্ভি হলে স্থাপন করা হয়।
নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিজমির ব্যবহার বজায় রেখেই বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভ্যাটিকানের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ইতালিতে সরবরাহ—তিনটি লক্ষ্যই একসঙ্গে পূরণ হতে পারে।












