রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক বিল পাস হয়েছে। বুধবার ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হওয়া বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে গেছে। ট্রাম্প স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে।
‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামে বিলটি প্রয়াত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গ্রাহাম দীর্ঘদিন ধরে এই উদ্যোগের পক্ষে ছিলেন। গত ১১ জুলাই আকস্মিকভাবে তার মৃত্যুর পরও বিলটি কংগ্রেসের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়।
গত মাসে সিনেটে ৮৬-১১ ভোটে বিপুল দ্বিদলীয় সমর্থনে বিলটি পাস হয়েছিল। এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে দেখা করে বিলটি পাসের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি সিনেটে একটি প্রক্রিয়াগত ভোটের সময় তিনি কক্ষের দর্শক আসনে বসে ভোট পর্যবেক্ষণও করেন।
রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাত লক্ষ্য
বিলটির মূল লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর চাপ বাড়ানো। একই সঙ্গে রাশিয়ার তেল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা ‘ছায়া বহর’ বা গোপন ট্যাংকার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য হলো রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আয় কমিয়ে দেওয়া। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নতুন আইনটি সেই চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ।
তবে বিলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত দিক হলো শুল্ক আরোপের ক্ষমতা। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চীন, ভারতসহ রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, রাশিয়ার জ্বালানি কিনে মস্কোর অর্থনীতিকে সহায়তা করছে—এমন দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ পাবে ওয়াশিংটন।
ডেমোক্র্যাটদের আপত্তি
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হলেও ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ এর বিরোধিতা করেছে। তাদের প্রধান আপত্তি হলো, বিলটি ট্রাম্পকে অতিরিক্ত শুল্ক ক্ষমতা দিচ্ছে, যা তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারেন।
ডেমোক্র্যাট নেতাদের যুক্তি, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য ট্রাম্পের হাতে এরই মধ্যে যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তিনি সেই ক্ষমতা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরেকটি আপত্তি হলো, জাতীয় স্বার্থের কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট যাতে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে পারেন, বিলটিতে সেই সুযোগ যথেষ্ট বিস্তৃত রাখা হয়েছে। ফলে আইনটি পাস হলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত সব নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
হাউস ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, বিলটিতে এত বেশি ব্যতিক্রম ও ফাঁকফোকর রয়েছে যে রাশিয়ার ক্ষতি করার মতো নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রয়োগ নাও হতে পারে। একই সঙ্গে তার আশঙ্কা, ট্রাম্প এই আইনের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের ওপরও ব্যাপক শুল্কের বোঝা চাপাতে পারেন।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও ছিল উদ্বেগ
বিলটি নিয়ে সব রিপাবলিকানও পুরোপুরি একমত ছিলেন না। দলের কিছু সদস্য আশঙ্কা করছিলেন, নতুন শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ।
তবু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ রিপাবলিকান বিলটির পক্ষে ভোট দেন। তাদের সঙ্গে ৫৮ জন ডেমোক্র্যাটও যোগ দেন। মাত্র সাতজন রিপাবলিকান বিলটির বিরুদ্ধে ভোট দেন।
এই দ্বিদলীয় সমর্থনকে বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেস থেকে এমন শক্তিশালী দ্বিদলীয় উদ্যোগ খুব কমই দেখা গেছে।
ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহেও বিলটির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিলটি আইনে পরিণত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং যারা এই উদ্যোগকে সমর্থন করছেন, তাদের তিনি ধন্যবাদ জানান।
ইউক্রেনের দৃষ্টিতে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমানো এবং মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎসে চাপ সৃষ্টি করা যুদ্ধের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিলটির সমর্থকদেরও বক্তব্য, এর মাধ্যমে রাশিয়াকে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হবে—ইউক্রেনের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন এখনও রয়েছে এবং সামরিক সংঘাতের অবসানের জন্য মস্কোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইকেল ম্যাককল বলেন, প্রতিনিধি পরিষদের ভোট লিন্ডসে গ্রাহামের ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।
এখন ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত
প্রতিনিধি পরিষদে অনুমোদনের পর বিলটির পরবর্তী গন্তব্য হোয়াইট হাউস। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে এবং রাশিয়া, ইরান এবং রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে।
তবে বিলের বাস্তব প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে ট্রাম্প কীভাবে নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করেন তার ওপর। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করা হলে তা শুধু রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি, আন্তর্জাতিক বাজার এবং ভোক্তা মূল্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ এখনও অব্যাহত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষই অবকাঠামো ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা উদ্যোগ যুদ্ধের সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।












