নেপালের নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার কয়েকটি এলাকায় সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস শুধু ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেয়নি, বহু পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, ব্যবসা, জমি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও একসঙ্গে মুছে দিয়েছে। কোথাও ঘরের জায়গায় পড়ে আছে কাদার স্তূপ, কোথাও নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় মানুষ নিজের বাড়ির জায়গাটুকুও আর চিনতে পারছেন না।
বন্যার পর এখন অনেকেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফিরে যাচ্ছেন—কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজতে, কেউ নিজেদের বাড়ির শেষ চিহ্নটুকু দেখতে। কিন্তু অনেকেরই মনে হচ্ছে, ফিরে যাওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
৪৩ বছর বয়সী পোশাক ব্যবসায়ী কল্পনা থাপা মাগার এমনই একজন। বন্যা ও ভূমিধসে তাঁর বাড়ি কাদার নিচে চাপা পড়ে গেছে। বিপদের মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, এক বন্ধু ফোন করে শুধু বলেছিলেন, “দৌড়াও! দৌড়াও!”
কল্পনা দৌড়েছিলেন। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখেন, সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এমনকি তাঁর পেছনে দৌড়ানো মানুষগুলোরও অনেকে আর ছিলেন না।
“এখন আমি যে পোশাক পরে আছি, সেটুকু ছাড়া আমার আর কিছুই নেই”—বন্যার পর নিজের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কল্পনার কণ্ঠে ফুটে ওঠে সর্বস্ব হারানোর বেদনা।
নুওয়াকোটের রাটামাটে এলাকায় ২১ বছর বয়সী নবিনা মাগারের বাড়িও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির সামনে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বহু কষ্টে একটি বাড়ি তৈরি করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বপ্নও এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
নবিনা বলেন, একটি বাড়ি তৈরি করে সুখে থাকার পর্যায়ে পৌঁছাতে তাঁদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। এখন বাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মনে হচ্ছে, বছরের পর বছর করা সব পরিশ্রম এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে।
ঋণ নিয়ে ব্যবসা, এখন আবার শূন্য থেকে শুরু
দেবীঘাট এলাকার ৩২ বছর বয়সী রোশন শ্রেষ্ঠর পরিবারেরও একই অবস্থা। বন্যায় তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ এবং নতুন চালু করা পোশাকের দোকান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য সম্প্রতি ঋণ নিয়েছিলেন রোশন। কিন্তু এখন সেই ঋণের বোঝা নিয়েই তাঁকে ভাবতে হচ্ছে কীভাবে আবার ব্যবসা দাঁড় করাবেন।
“বন্যায় আমাদের পারিবারিক ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গাড়ির ওয়ার্কশপ এবং নতুন খোলা পোশাকের দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসার জন্য আমি সম্প্রতি ঋণ নিয়েছিলাম। এখন সবকিছু আবার শুরু করতে হবে”—বলেছেন রোশন।
দেবীঘাটের দিকে এগোলে বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও বাড়ির শুধু কাঠামোর কিছু অংশ দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও বাড়ির অস্তিত্ব বোঝার মতো কোনো চিহ্নই নেই। বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ থেকে যতটুকু সম্ভব নিজেদের জিনিসপত্র উদ্ধার করছেন।
বাড়ির চাবি আছে, কিন্তু বাড়িটিই নেই
মাধব ঘিমিরে ও তাঁর স্ত্রী আম্বিকা আরিয়ালের ছয় কক্ষের বাড়িটি ছিল দেবীঘাটে। এখন সেখানে দাঁড়িয়ে বাড়িটির জায়গা খুঁজে পাওয়াই কঠিন।
নদীর গতিপথ বদলে গিয়ে বন্যার স্রোত তাঁদের বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। চারপাশের দৃশ্য এতটাই বদলে গেছে যে তাঁরা আর নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না, ঠিক কোথায় তাঁদের বাড়িটি ছিল।
তবু মাধবের হাতে রয়েছে সেই বাড়ির চাবি।
সবকিছু হারিয়েও তিনি চাবিটি সঙ্গে করে রেখেছেন। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি ধাতব বস্তু নয়—এটি তাঁর হারিয়ে যাওয়া ঘর, পরিবার এবং জীবনের স্মৃতি।
“আমি সবকিছু হারিয়েছি। তবু বাড়ির চাবিটা সঙ্গে করে এনেছি। এটা আমাকে এমন একটা অনুভূতি দেয় যে আমার কাছে এখনও সবকিছু আছে”—মাধব বলেন।
বন্যার পর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই চাবিটি যেন একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ প্রতীক হয়ে উঠেছে।
২০১৫ সালের ভূমিকম্পের স্মৃতিও ফিরে এসেছে
নেপালের অনেক পরিবার এর আগেও ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে দেশটিতে প্রায় ৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
শিক্ষিকা সীতা থাপা মাগার, ৪৫, কল্পনার বড় বোন। ভূমিকম্পের সময়ও তাঁদের পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু তখন অন্তত কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। নিজেদের জমিতে আবার ঘর তৈরি করার সুযোগও ছিল।
এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
তাঁর স্বামীর সঙ্গে মালিকানাধীন দুটি বাড়িই বন্যায় ভেসে গেছে। তাঁদের কৃষিজমিও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।
“এবার আমরা সবকিছু হারিয়েছি”—সীতার এই কথার মধ্যে ফুটে ওঠে দুর্যোগের পর নতুন করে জীবন শুরু করার অনিশ্চয়তা।
সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা একটি শহর এখন ধ্বংসস্তূপ
৬১ বছর বয়সী শান্তি ডাঙ্গোলের হাতে ছিল তাঁর তিনতলা আবাসিক ভবনের একটি ছবি। ভবনটি একসময় দাঁড়িয়ে ছিল যেখানে, এখন সেখানে পড়ে আছে কেবল একটি ভাঙা টাইলস।
বেট্রাওয়াতি একসময় ছিল ব্যস্ত ও সমৃদ্ধ একটি শহর। তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের আনাগোনা ছিল সেখানে। সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠেছিল। বড় বাড়ি তৈরি করেছিল, ভাড়ার জন্য কক্ষ বানিয়েছিল, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছিল।
কিন্তু বন্যা ও ভূমিধস সেই অগ্রগতির বড় অংশই মুছে দিয়েছে।
শান্তি বলেন, কিছুদিন আগেও এলাকার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ভালো করছিলেন। এখন সেখানে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই।
“আমি সবকিছু হারিয়েছি। আমার কাছে এখন শুধু এই শরীরটুকু আছে। কিন্তু নিজেকে একজন মৃত মানুষের মতো মনে হচ্ছে”—তাঁর কথায় ধরা পড়ে ভয়াবহ ক্ষতির মানসিক অভিঘাত।
ঋণের বোঝা নিয়েও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
৪০ বছর বয়সী সুনীতা চিত্রকারের বাড়িও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বাড়ি হারানোর পাশাপাশি তাঁর সামনে রয়েছে আরেকটি বড় দুশ্চিন্তা—ঋণ পরিশোধ।
“আমি সবচেয়ে বেশি চিন্তিত, কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব”—সুনীতার উদ্বেগ শুধু একটি পরিবারের নয়; বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বহু ছোট ব্যবসায়ী ও পরিবার এখন একই প্রশ্নের মুখোমুখি।
৫১ বছর বয়সী সূর্য লাল চিত্রকারের বাড়ি ও ব্যবসা দুটিই ত্রিশুলি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। যেখানে তাঁর ঘর ও ব্যবসা ছিল, এখন সেখানে পড়ে আছে ধ্বংসের চিহ্ন।
“সবকিছু চলে গেছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না”—বলেছেন তিনি।
আগের বন্যার সঙ্গে এবারকার পার্থক্য
২৬ বছর বয়সী বিবেক চিত্রকারের বাড়ি ও মাছ ধরার সরঞ্জামের দোকানের নিচতলা কাদায় ভরে গেছে। বন্যার পানি আসার সময় তিনি গ্রামের মানুষকে দ্রুত সরে যেতে বলেছিলেন।
কিন্তু সবাই তাঁর সতর্কতা গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি।
বিবেক জানান, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু অনেকে বিশ্বাস করেননি। তাঁদের ধারণা ছিল, আগের বন্যার মতোই এবারও পরিস্থিতি সামলে যাবে।
কিন্তু এবার পানির আচরণ ছিল ভিন্ন। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের স্রোত অনেক পরিবারকে প্রস্তুতির সুযোগই দেয়নি।
১৯ বছর বয়সী সচিতা রাই নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তাঁর ৮০ বছর বয়সী দাদু মান বাহাদুর রাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও পরিবারের বয়স্ক সদস্যকে বাঁচানোর সেই চেষ্টা বন্যার আরেকটি মানবিক গল্প হয়ে আছে।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই
নেপালের এসব এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়—মানুষগুলো কীভাবে আবার জীবন শুরু করবেন, সেটিই।
কারও বাড়ি নেই, কারও জমি নেই। কারও ব্যবসা ধ্বংস হয়েছে, কারও হাতে ঋণের কাগজ। কেউ নিজের বাড়ির জায়গাটুকুও আর চিনতে পারছেন না। আবার কেউ একটি চাবি, পুরোনো ছবি কিংবা উদ্ধার করা কয়েকটি জিনিস আঁকড়ে ধরে অতীতের সঙ্গে সম্পর্কটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
বন্যার পানি নেমে গেছে, কিন্তু ক্ষত রয়ে গেছে মানুষের জীবনে। যেসব পরিবার বছরের পর বছর পরিশ্রম করে একটু স্বচ্ছলতা তৈরি করেছিল, তাদের অনেককেই এখন আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হবে।
কাদার নিচে চাপা পড়েছে শুধু ঘরবাড়ি নয়—চাপা পড়েছে বহু বছরের সঞ্চয়, স্বপ্ন, নিরাপত্তার অনুভূতি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও। তবু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই মানুষ খুঁজছেন বেঁচে থাকার পথ। কারও হাতে বাড়ির চাবি, কারও হাতে পুরোনো ছবির টুকরো, কারও হাতে উদ্ধার করা সামান্য কিছু জিনিস—এসবই এখন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া জীবনের স্মারক।












