চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র সফরকে ঘিরে হোয়াইট হাউসে এবার শুধু আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়, দুই দেশের শীর্ষ নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সৌহার্দ্য প্রদর্শনেরও বিশেষ আয়োজন করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প আগামী সপ্তাহে শি জিনপিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগত জানাবেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা এই সফরকে অনেকটা ‘ডিপ্লোম্যাটিক ডাবল ডেট’ বা কূটনৈতিক যুগল-সাক্ষাৎ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে এই আনুষ্ঠানিক সৌহার্দ্যের আড়ালেই থাকবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষি। সফরের আলোচনায় বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিরল খনিজ, শুল্ক, ফেন্টানিলের কাঁচামাল এবং চীনা বিনিয়োগসহ একাধিক স্পর্শকাতর বিষয় গুরুত্ব পাবে।
বিমানঘাঁটিতে শিকে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প
শি জিনপিং ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে পৌঁছালে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছেন ট্রাম্প। বিদেশি কোনো নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি বিমানঘাঁটিতে যাওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল। এরপর শুরু হবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি। পরদিন হোয়াইট হাউসে শি ও পেং লিয়ুয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প ও মেলানিয়া। হোয়াইট হাউসের স্টেট ফ্লোরে হবে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। এরপর রোজ গার্ডেনে সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করবেন দুই নেতা। তারপর তাঁরা বৈঠকে বসবেন দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।
হোয়াইট হাউসে জমকালো রাষ্ট্রীয় ভোজ
সফরের অন্যতম আকর্ষণ হবে ২৪ সেপ্টেম্বরের রাষ্ট্রীয় ভোজ। ট্রাম্প ও মেলানিয়া ট্রাম্পের আয়োজনে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে শি জিনপিং ও পেং লিয়ুয়ানকে সম্মানিত করা হবে। ভোজে ট্রাম্প ও শি—দুই প্রেসিডেন্টই বক্তব্য দেবেন।
এই ভোজে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও ব্যবসা জগতের পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, গুগলের সুন্দর পিচাই, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান এবং ডেল টেকনোলজিসের মাইকেল ডেল।
এই অতিথি তালিকাও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন ক্ষেত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে রাষ্ট্রীয় ভোজের সামাজিক আবহের মধ্যেও প্রযুক্তি, ব্যবসা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের বার্তা স্পষ্ট থাকবে।
আলাদা কর্মসূচিতে মেলানিয়া ও পেং
ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পাশাপাশি দুই দেশের ফার্স্ট লেডির জন্যও আলাদা কর্মসূচি রাখা হয়েছে। শি ও ট্রাম্প যখন কঠিন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করবেন, তখন মেলানিয়া ট্রাম্প ও পেং লিয়ুয়ান আলাদা একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। তবে সেই কর্মসূচির বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। পরদিন, অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর, শি ও পেং আবার ট্রাম্প ও মেলানিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত চায়ের আড্ডায় অংশ নেবেন। এরপর ট্রাম্প দম্পতি তাঁদের নিয়ে যাবেন ন্যাশনাল আর্কাইভসে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ও রাষ্ট্রগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো দেখার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপনের বছর হওয়ায় এই সফরের প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে। সৌহার্দ্যের আড়ালে কঠিন দর-কষাকষি
তবে সফরের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একাধিক কঠিন প্রশ্ন রয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বর্তমান সমঝোতার মেয়াদ নভেম্বরেই শেষ হওয়ার কথা। তাই শি-ট্রাম্প বৈঠকে শুল্ক ও বাণিজ্যিক বিরতি বাড়ানো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
ওয়াশিংটন কিছু অ-কৌশলগত পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও বিরল খনিজ নিয়ে অবস্থান নরম করার সম্ভাবনা কম। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসব খনিজের সরবরাহে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার এবং চীনা কোম্পানির যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের বিষয়ও তুলতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও আলোচনার বড় বিষয়। দুই দেশই এ প্রযুক্তিতে বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে। একই সঙ্গে এআইয়ের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহারের নিয়ম নিয়েও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ফেন্টানিল তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করা, আটক বিদেশি নাগরিকদের বিষয় এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কও আলোচনায় আসতে পারে। পাশাপাশি তাইওয়ান, ইরান যুদ্ধ এবং দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও শীর্ষ বৈঠকের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তৈরি করবে।
‘ডাবল ডেট’ নয়, বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা
বাহ্যিকভাবে শি ও পেংকে ঘিরে ট্রাম্প-মেলানিয়ার এই আয়োজন দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতা ও ব্যক্তিগত কূটনীতির বার্তা দিতে পারে। কিন্তু এর আসল গুরুত্ব থাকবে বৈঠকের ফলাফলে। বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকি কমানো, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা সামলানো, বিরল খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুই পরাশক্তির মধ্যে নতুন সংঘাত ঠেকানোর ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে হোয়াইট হাউসের ‘ডাবল ডেট’ যতটা আড়ম্বরপূর্ণ, এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব ততটাই কঠিন। ট্রাম্প ও শি ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা কতটা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন—সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।












