ডেঙ্গু মোকাবিলায় বড় এক অগ্রগতির পথে এগোচ্ছে ভারত। প্রথমবারের মতো দেশটির বাজারে আসতে যাচ্ছে ডেঙ্গুর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (QDENGA)। জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি এই টিকা ভারতের প্রধান ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন—সিডিএসসিওর অনুমোদন পেয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধেই ভারতের বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে টিকাটি পাওয়া যেতে পারে।
ভারতে কিউডেঙ্গার বাজারজাত ও বিপণনের দায়িত্ব পেয়েছে দেশটির ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ড. রেড্ডিজ ল্যাবরেটরিজ। অনুমোদিত ব্যবহারের আওতায় ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী মানুষ এই টিকা নিতে পারবেন।
চার ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা
কিউডেঙ্গা ‘TAK-003’ নামেও পরিচিত। এটি একটি লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড বা দুর্বল প্রকৃতির ভাইরাসভিত্তিক টিকা। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন—DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4—এর বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে টিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
টিকাটির পূর্ণ কোর্সে দুইটি ডোজ নিতে হয়। প্রথম ডোজের তিন মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
কিউডেঙ্গার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, টিকা নেওয়ার আগে ব্যক্তির আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ নির্ধারিত বয়সসীমার সুস্থ ব্যক্তিরা পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস যাচাইয়ের জন্য আলাদা রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই টিকা নিতে পারবেন।
ভারতে ডেঙ্গুর বড় চাপ
গত দুই দশকে ভারতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের একটি বড় অংশই ভারতে রয়েছে। ফলে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা ও টিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে সাধারণত উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
বিশেষ করে রক্তক্ষরণ, রক্তের প্লাজমা কমে যাওয়া এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বজুড়েও স্বীকৃতি
কিউডেঙ্গা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রিকোয়ালিফিকেশনও অর্জন করেছে টিকাটি। ফলে ভারতের বাজারে এর প্রবেশকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, কিউডেঙ্গা বাজারে এলেই ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। টিকা ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু রোগ নিয়ন্ত্রণে এর পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার বন্ধ করাও জরুরি।
বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা—সবকিছু একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে।
২০২৭ সালে ভারতে কিউডেঙ্গার যাত্রা শুরু হলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে এর দাম কত নির্ধারণ করা হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য টিকাটি কতটা সহজলভ্য হয়। কারণ ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকা দেশটিতে টিকার কার্যকারিতার পাশাপাশি এর মূল্য ও প্রাপ্যতাও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।












