যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল বাড়ছে। দুই দেশের নেতারা এমন এক সময়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, যখন বিশ্ব রাজনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও যুদ্ধের নানা সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যেই বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এবারের বৈঠকে আগের তুলনায় তুলনামূলক শক্ত অবস্থান নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে চীন।
দুই দেশ সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠার দিকে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটনের বৈঠকে সেই সমঝোতাকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে কি না।
চীনের শক্ত অবস্থানের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা। বৈঠকের আগে বেইজিং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় চীনের হাতে আগের তুলনায় বেশি কূটনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিশেষ করে ইউক্রেন ও ইরানের সংঘাতের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। ওয়াশিংটন এসব সংঘাতের সমাধানে অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা চালালেও দ্রুত কোনো যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী সমঝোতা এখনো নিশ্চিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বৈঠকের কয়েক সপ্তাহ আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সফরসূচিও বেইজিংয়ের কূটনৈতিক সক্রিয়তার একটি বড় উদাহরণ। তিনি কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন। এরপর মিসরে রাষ্ট্রীয় সফর করেন।
এই সফরগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; এর মাধ্যমে চীন ইউরেশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। ফলে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় শি জিনপিং শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নিয়েই নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমীকরণ সামনে রেখেও কথা বলার সুযোগ পাবেন।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, তাইওয়ান, ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। এসব বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাই বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তি না এলেও, উভয় পক্ষের আলোচনার পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বেইজিংকে এমন একটি অবস্থান দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটি শুধু মার্কিন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানানোর অবস্থানে থাকবে না; বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট ও আঞ্চলিক সমীকরণে নিজের প্রভাবকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন ও ইরানের মতো সংকটে চীনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনায় একাধিক জটিল বিষয় একসঙ্গে উঠে আসবে।
ফলে শি–ট্রাম্প বৈঠক কেবল দুই প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব, সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী অধ্যায়ের ইঙ্গিতও দিতে পারে। বৈঠকের আগে চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এবার ওয়াশিংটনের আলোচনার টেবিলে বেইজিং আগের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে থাকতে চাইছে।












