বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার চীনে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে নতুন কৌশল নিচ্ছে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা। কোম্পানিটি আগামী বসন্ত থেকে চীনে এমন বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদন শুরু করতে যাচ্ছে, যেগুলো ব্যাটারির পাশাপাশি একটি জ্বালানি-চালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করে গাড়ির চলার দূরত্ব বাড়াতে পারবে।
টয়োটার এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ‘এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ ইলেকট্রিক ভেহিকল’ বা দীর্ঘপথ চলার সক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে আরও সরাসরি প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই।
বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত গাড়ির পাশাপাশি এমন গাড়ির চাহিদাও তৈরি হচ্ছে, যেগুলো দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার সময় ব্যাটারি শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে। টয়োটা মনে করছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের দীর্ঘপথ চলতে সক্ষম বৈদ্যুতিক গাড়ি তাদের বিদ্যুতায়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
চীনে টয়োটার এই নতুন গাড়ি উৎপাদনের সিদ্ধান্তের পেছনে দেশটির বিশাল বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার বড় ভূমিকা রাখছে। চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার। স্থানীয় নির্মাতারা সেখানে দ্রুত নতুন প্রযুক্তি ও নতুন মডেল নিয়ে আসছে। ফলে টয়োটার মতো ঐতিহ্যবাহী বৈশ্বিক গাড়ি নির্মাতাদের জন্যও চীনের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টয়োটা ইতিমধ্যে চীনের বাজারের জন্য ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে bZ3X মডেল। তবে নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে কোম্পানিটি বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিসর আরও বাড়াতে চাইছে। অর্থাৎ শুধু সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত গাড়ির ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুতায়িত গাড়ি নিয়ে বাজারে উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ বৈদ্যুতিক গাড়িতে সাধারণত গাড়ির চাকা বৈদ্যুতিক মোটরের মাধ্যমে চালিত হয়। তবে ব্যাটারি থেকে পর্যাপ্ত শক্তি না পাওয়া গেলে একটি ছোট জ্বালানি-চালিত ইঞ্জিন বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। এতে গাড়িটি প্রচলিত সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত গাড়ির তুলনায় দীর্ঘ দূরত্বে চলার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
এই প্রযুক্তি বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে দীর্ঘ যাত্রায় চার্জিং অবকাঠামো এবং চার্জ দিতে প্রয়োজনীয় সময় বড় বিবেচনার বিষয়। এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ প্রযুক্তি সেই উদ্বেগ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করে।
টয়োটার জন্য চীনে এই ধরনের গাড়ি উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় বাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানো। চীনের গাড়ির বাজারে প্রযুক্তি, দাম, গাড়ির পরিসর এবং নতুন মডেল আনার গতির ওপর ক্রেতাদের আগ্রহ অনেকটাই নির্ভর করছে। স্থানীয় নির্মাতারা দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আনায় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকেও তাদের পণ্য কৌশল নতুন করে সাজাতে হচ্ছে।
টয়োটা দীর্ঘদিন ধরে হাইব্রিড গাড়ির প্রযুক্তিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কোম্পানিটি ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্লাগ-ইন হাইব্রিড এবং অন্যান্য বিদ্যুতায়িত প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করছে। নতুন এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ মডেল সেই বহুমুখী বিদ্যুতায়ন কৌশলেরই আরেকটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনে উৎপাদন শুরু হলে টয়োটা স্থানীয় বাজারের জন্য তুলনামূলক দ্রুত নতুন মডেল সরবরাহ করতে পারবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা ও উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার সুযোগও তৈরি হবে।
বিশ্বের গাড়ি শিল্পে এখন বিদ্যুতায়নের প্রতিযোগিতা শুধু ব্যাটারি প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গাড়ির দাম, একবার চার্জে কত দূরত্ব চলতে পারে, চার্জিংয়ের সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের স্থানীয় চাহিদা—সবকিছু মিলিয়ে নির্মাতারা নিজেদের কৌশল ঠিক করছে। টয়োটার চীনে এক্সটেন্ডেড-রেঞ্জ বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনশীল প্রতিযোগিতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সব মিলিয়ে, চীনে নতুন ধরনের বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের মাধ্যমে টয়োটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে নিজেদের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা অনুযায়ী, দীর্ঘপথ চলতে সক্ষম বৈদ্যুতিক গাড়ি ভবিষ্যতের বিদ্যুতায়িত যানবাহন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই মডেল চীনের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টয়োটাকে কতটা এগিয়ে নিতে পারে।












