মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিংবা দেশটির নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের ওপর নতুন করে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে।
রোববার ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাব হবে কঠোর ও ধারাবাহিক। যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদেরও তারা সংঘাতের পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, তাদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একটি হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে ওই তথ্যের বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প এক ফক্স নিউজ প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ইরানের নেতাদের দ্রুত একটি চুক্তিতে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ইরানকে সমঝোতা করতে হবে, নইলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হবে অথবা দেশটির নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। তবে একই সময়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে এলে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতেও তিনি প্রস্তুত।
গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। কোনো পক্ষই বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয়। এর মধ্যেই সংঘাতের প্রভাব ইরানের অর্থনীতি ছাড়িয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
রিয়াদে হুথিদের হামলা
এই উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী। এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে হুথিরা বেশ কিছু সামরিক সাফল্যও পেয়েছে।
রয়টার্সের ভিডিওতে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশ থেকে রাতের আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে মার্কিন নাগরিকদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল এবং আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
সৌদি সরকার হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডে আরও কয়েকটি হামলার চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সৌদি আরবকে কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে ফেলেছে। ইয়েমেনে হুথিদের আরও ভূখণ্ড দখল ঠেকাতে রিয়াদকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। আবার সেই অভিযান চালালে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও বাড়তে পারে।
বাব আল-মান্দাব ঘিরে নতুন শঙ্কা
ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের সামরিক অগ্রগতির কারণে এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই জলপথ লোহিত সাগর ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
হুথিদের হাতে এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালির সংকট। ইরান ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও জ্বালানি রপ্তানি বিশ্ববাজারে পৌঁছানো ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে সংকটের মধ্যে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
ইরানের ওপরও বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের বন্দরগুলো দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়ছে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়লেও ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেনি। রোববার তেহরান আবারও জানায়, জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্তগুলো তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু শর্তগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে বিরোধের জেরে জুলাইয়ে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে সংঘাত থামানোর নতুন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ রোববার বলেন, শত্রুদের মোকাবিলা করা এবং অর্জনগুলো কূটনীতির মাধ্যমে ধরে রাখতে ইরানকে একই সঙ্গে লড়াই ও আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
আলোচনার সুযোগ, নাকি আরও বড় সংঘাত?
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে ট্রাম্পের বৈঠকে আগ্রহ প্রকাশ পরিস্থিতিতে কিছুটা কূটনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। তবে একই সময়ে দুই দেশের সামরিক হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হুথি হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ফলে এখন বড় প্রশ্ন হলো—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার আলোচনার পথে ফিরবে, নাকি নতুন সামরিক সংঘাতের দিকে এগোবে। হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ববাজার, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।












