পাকিস্তানের রাজনীতি, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোতে পাঞ্জাবের প্রভাব দীর্ঘদিনের। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল এই প্রদেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল থেকে সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা আসায় সমালোচকদের অনেকেই মনে করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা ক্রমেই পাঞ্জাবকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। এর ফলে বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) ও সিন্ধুর মতো প্রদেশগুলোর মধ্যে বঞ্চনা ও অবিশ্বাসের অনুভূতি বাড়ছে।
তবে পাঞ্জাবকে পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের জন্য এককভাবে দায়ী করাও যথার্থ নয়। বিষয়টি বুঝতে হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ক্ষমতার কাঠামোর পরিবর্তন, বিভিন্ন প্রদেশের সঙ্গে কেন্দ্রের সম্পর্ক এবং সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হয়।
পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে পাঞ্জাবের আধিপত্যের আলোচনা মূলত মধ্য পাঞ্জাবকে ঘিরে। কারণ, প্রদেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সারাইকি অধ্যুষিত এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলাদা প্রদেশের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু লাহোরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই দাবি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয় বলে সমালোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর একটি মন্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের প্রতিবেশীরা দেশটির ক্ষতি করছে না; বরং বেলুচিস্তান ও কেপির পরিস্থিতিই পাঞ্জাবের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই বক্তব্যকে সমালোচকেরা প্রাদেশিক বৈষম্যের গভীর মানসিকতার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
পাকিস্তানের জন্ম থেকেই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামোতে প্রথমদিকে মুহাজিরদেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আধিপত্য কমে আসে। ফেডারেল রাজধানী করাচি থেকে রাওয়ালপিন্ডি এবং পরে ইসলামাবাদে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ বিলুপ্ত করে ‘ওয়ান ইউনিট’ ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল লাহোর।
এই পরিবর্তন শুধু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে নয়, বেলুচিস্তান, তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং সিন্ধুতেও বঞ্চনার অনুভূতি বাড়ায়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশটির সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল হয়ে ওঠে পাঞ্জাব। এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় পাঞ্জাবের ওজন আরও বেড়ে যায়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও বড় সংঘাত তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই সময় জুলফিকার আলী ভুট্টো—যিনি পাঞ্জাবি ছিলেন না, বরং সিন্ধুর গ্রামীণ এলাকা থেকে উঠে এসেছিলেন—পাঞ্জাবি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে সমালোচনা রয়েছে।
এরপর ১৯৭৪ সালে বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন পাঞ্জাবি কর্মকর্তার নামও জড়িয়ে আছে।
কেন পাঞ্জাবকে ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ বলা হয়
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে পাঞ্জাবের প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন ধরেই বড়। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রায় ৬৫ শতাংশ কর্মকর্তা ও সদস্য মধ্য ও উত্তর পাঞ্জাব থেকে আসেন। ফলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামোতেও পাঞ্জাবের প্রভাব দৃশ্যমান।
ফেডারেল আমলাতন্ত্রেও মধ্য পাঞ্জাবের প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্য। উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টসহ বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও পাঞ্জাবি বিচারকদের বড় উপস্থিতি রয়েছে বলে সমালোচকেরা দাবি করেন। একই প্রবণতা করপোরেট ব্যবসা, শিল্প এবং উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামোতেও দেখা যায়।
এই বাস্তবতা অন্য প্রদেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে—পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে কি সব প্রদেশের মানুষের সমান সুযোগ রয়েছে?
বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও কেপির রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কম।
বেলুচিস্তানের খনিজ সম্পদ নিয়ে ফেডারেল সরকারের একজন মন্ত্রীর বক্তব্যও এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, বেলুচিস্তানে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ রয়েছে। সমালোচকেরা মনে করেন, স্থানীয় জনগণের অধিকার ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত না করে প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে কেন্দ্রের অতিরিক্ত নজর দেওয়াই বেলুচ জাতীয়তাবাদী ক্ষোভের অন্যতম কারণ।
বেলুচিস্তান থেকে কেপি—বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
পাকিস্তানের ইতিহাসে পাঞ্জাবের সঙ্গে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও প্রদেশের রাজনৈতিক জোটও পরিবর্তিত হয়েছে।
জিয়াউল হকের শাসনামলে পাঞ্জাবের সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্বের সঙ্গে পশতুনদের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয় তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বর্তমান কেপি, দীর্ঘ সময় কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে।
কিন্তু গত দুই দশকে সেই সম্পর্কের মধ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে। কেপিতে সন্ত্রাসবাদ, সামরিক অভিযান, সোয়াত ও সাবেক ফাটা অঞ্চলে নিরাপত্তা অভিযান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কেন্দ্রের সঙ্গে পশতুনদের দূরত্ব বেড়েছে।
ইমরান খানের সরকার ২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাঞ্জাব ও কেপির রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়। পিটিআই-নিয়ন্ত্রিত কেপি সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে—এমন অভিযোগও ওঠে। ফলে পাঞ্জাবকেন্দ্রিক সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি কেপির একটি অংশের অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ধরে রাখতে গ্রামীণ সিন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে কাছে টানার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু সিন্ধুতে অতীতের সামরিক অভিযান এবং সম্পদ বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের কারণে সেই প্রচেষ্টাও পুরোপুরি সফল হয়নি।
তাহলে কি পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে অভিযোগই সব?
এখানেই বিষয়টির আরেকটি দিক রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, পাঞ্জাবের আধিপত্য পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশকে বঞ্চিত করছে। কিন্তু পাঞ্জাবের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি হলো—পাঞ্জাবের মানুষ পরিশ্রমী, উদ্যোক্তা এবং শিল্প ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে। তারা যদি নিজেদের দক্ষতার কারণে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকে, তাহলে শুধু তাদের প্রাদেশিক পরিচয়ের কারণে সেই সাফল্যকে আধিপত্য হিসেবে দেখানোও অন্যায্য।
এই যুক্তির মধ্যে কিছু সত্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নটি আলাদা। কোনো একটি অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সফল হওয়া এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্ব—দুটি একই বিষয় নয়।
মূল প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, করপোরেট খাত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্য কতটা রয়েছে।
পাঞ্জাব ভাগের প্রশ্নেও রাজনীতি
পাঞ্জানের রাজনৈতিক আধিপত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রদেশটির প্রশাসনিক পুনর্গঠন।
সমালোচকেরা মনে করেন, পাঞ্জাবের আয়তন ও জনসংখ্যা এত বড় যে এটিকে কয়েকটি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করা হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বাড়তে পারে। দক্ষিণ পাঞ্জাবে আলাদা সারাইকি প্রদেশের দাবিও দীর্ঘদিনের।
কিন্তু পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন), যার রাজনৈতিক ভিত্তি মূলত পাঞ্জাবকেন্দ্রিক, পাঞ্জাব ভাগের বিষয়ে অনাগ্রহী বলে সমালোচনা রয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি কেপি বা সিন্ধুর মতো প্রদেশকে প্রশাসনিকভাবে ভাগ করার পক্ষে যুক্তি থাকে, তাহলে একই যুক্তি পাঞ্জাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয় কি?
এই দ্বৈত অবস্থানই পাঞ্জাবকেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি।
পাকিস্তান কি শুধু পাঞ্জাব?
পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে তাই শুধু পাঞ্জাব নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে ভাগ হবে—সেই প্রশ্নটি রয়েছে।
দেশটির বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা। পাঞ্জাবি ভাষা পাঞ্জাবের প্রধান ভাষা হলেও পশতুন, সিন্ধি, বেলুচ, সারাইকি ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ভিন্ন। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উর্দুকে সাধারণ যোগাযোগের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
কিন্তু ভাষা ও পরিচয়ের এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকে, তাহলে প্রাদেশিক জাতীয়তাবাদ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
পাঞ্জাবের সঙ্গে অন্য প্রদেশগুলোর সম্পর্ক তাই শুধু সম্পদ বা প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি আস্থারও প্রশ্ন।
সমাধানের পথ কী
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব, কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সব প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে অন্য প্রদেশগুলোর মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হতে পারে যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো একটি অঞ্চল বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।
একই সঙ্গে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
পাকিস্তান একটি বহু জাতি ও বহু অঞ্চলের রাষ্ট্র। তাই দেশটির স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে কোনো একটি প্রদেশ কতটা শক্তিশালী তার ওপর নয়; বরং সব প্রদেশ নিজেদের রাষ্ট্রের সমান অংশীদার মনে করছে কি না, তার ওপর।
পাঞ্জাবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বেলুচিস্তান, কেপি, সিন্ধু এবং দক্ষিণ পাঞ্জাবের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার সবচেয়ে শক্তিশালী অঞ্চলটি অন্য অঞ্চলগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার না করে তাদের সঙ্গে ক্ষমতা ও সম্পদ ভাগ করে নেয়।












