ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নতুন কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তার বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। দেশটির সামরিক নেতৃত্ব বলেছে, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর হামলা হলে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এর জন্য বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে।
২১ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ ও খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর এ সতর্কবার্তা দেয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর ৪৬তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবছর এই সময় ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ’ পালন করা হয়।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের উত্তরাধিকার
বিবৃতিতে আট বছরব্যাপী ইরান-ইরাক যুদ্ধকে জাতীয় প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরানের দাবি, সামরিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় শক্তিগুলোর চাপের মধ্যেও দেশটি তার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে সক্ষম হয় এবং শেষ পর্যন্ত আগ্রাসীদের পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্ব বলেছে, ওই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী কয়েক দশকে প্রতিরক্ষা শিল্পের অগ্রগতি দেশটির সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। এর ফলে পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণেও পরিবর্তন এসেছে বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের ব্যাপক সমর্থনকে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর সংঘাতে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামোয় ইরান উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
নতুন হামলার আশঙ্কায় উত্তেজনা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই নতুন এই হুঁশিয়ারি এলো। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের সামরিক কমান্ড জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন তথ্য তারা পেয়েছে। এর পরই তেহরান সতর্ক করে, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও স্বার্থের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবারের বিবৃতিতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নয়, তাদের মিত্র এবং ইরানের বিরুদ্ধে বৈরী কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারীদেরও সতর্ক করা হয়েছে।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার
ইরানের সেনাবাহিনী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষীরা দেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের অধিকার ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কাজ করে যাবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো এই দায়িত্ব থেকে সরে আসবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইরানের সামরিক নেতৃত্বের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটির বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানো পক্ষগুলোকে ভবিষ্যতে আরও পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ শুরু
ইরানে বার্ষিক পবিত্র প্রতিরক্ষা সপ্তাহ শুরু হওয়ার সময়েই এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৯৮০-১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রতিরোধ এবং নিহতদের স্মরণে এ সময় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
এবারের আয়োজন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে ১৯৮০-এর দশকের যুদ্ধের স্মৃতি আবারও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তেহরানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে ওই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী বহিরাগত চাপের মধ্যেও জাতীয় সংহতি ও প্রতিরোধের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের নতুন সামরিক হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির সামরিক পরিস্থিতি যে এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিবৃতিটির সময় ও ভাষ্য তা স্পষ্ট করেছে।












