গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষর হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে চুক্তিটি স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে। ডেনমার্কের দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের হাতে থাকবে না; বরং এতে ন্যাটোর ভূমিকাও আরও স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এতে ১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে কি না, সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড বলছে, নতুন ব্যবস্থায় গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে এবং দ্বীপটির নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
আর্কটিক নিরাপত্তায় ন্যাটোর বড় ভূমিকা
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন বলেছেন, নতুন ব্যবস্থায় আর্কটিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু ডেনমার্ক বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ন্যাটো জোটই বৃহৎ পরিসরে এই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।
তার ভাষায়, আর্কটিকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ন্যাটোর ভূমিকা আরও বড় হবে। ডেনমার্কের এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক চাপ ন্যাটোর অভ্যন্তরেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল।
চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়াতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আরও দুটি স্থানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর একটি হতে পারে নারসারসুয়াক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধের সময় সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ছিল। ১৯৫০-এর দশকে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এলাকাটির জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। বর্তমানে সেখানে কয়েক ডজন মানুষ বসবাস করেন।
অন্য সম্ভাব্য স্থান মেস্টারসভিগ। বর্তমানে সেখানে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ বাহিনীর একটি ইউনিট সেরিয়াস ডগ স্লেজ প্যাট্রোল কাজ করে।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন নয়। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া প্রয়োজন। কখনো কখনো তিনি দ্বীপটি অধিগ্রহণের জন্য সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। তার এমন বক্তব্য ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করে এবং ন্যাটোর মধ্যেও কূটনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।
জানুয়ারিতে সেই চাপ সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে। নতুন নিরাপত্তা চুক্তিকে সেই দীর্ঘ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, নতুন চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রয়োজনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি আরও বলেছেন, ওয়াশিংটনের লিখিত অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি বা সামরিক উপস্থিতি স্থাপন করতে পারবে না।
ডেনমার্ক এখনো ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই মার্কিন আগ্রহ
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহের ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। ১৯৪১ সালে জার্মানি ডেনমার্ক দখল করে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ডেনমার্কের তৎকালীন দূত হেনরিক কাউফম্যানের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির পথ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল গ্রিনল্যান্ডকে জার্মানির নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর আটলান্টিক যোগাযোগপথ নিরাপদ রাখা।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডজুড়ে বিমানঘাঁটি, নৌ স্থাপনা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করে। ১৯৪৩ সালের মধ্যে সেখানে মার্কিন সামরিক সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার ৫০০-তে পৌঁছেছিল।
১৯৪৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। প্রায় ১০ কোটি ডলারের সমমূল্যের সোনার বিনিময়ে দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও কোপেনহেগেন তা প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর ১৯৫১ সালে নতুন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। সেই চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ব্যাপক অধিকার দেওয়া হয়। একই সঙ্গে এর সঙ্গে ন্যাটোর অস্তিত্বের সম্পর্কও ছিল।
শীতল যুদ্ধের পর বদলে গেছে পরিস্থিতি
শীতল যুদ্ধের সময় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ছিল অনেক বড়। তখন সেখানে ১৭টি সামরিক স্থাপনা এবং ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সামরিক সদস্য ছিল।
বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক উপস্থিতি এখন পিতুফিক স্পেস বেসকে কেন্দ্র করে, যেখানে প্রায় ১৫০ মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন।
তবে আর্কটিক অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব আবারও বাড়ছে। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটোর মধ্যে আর্কটিককে ঘিরে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।
ন্যাটো নতুন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। জোটটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
সার্বভৌমত্ব নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের আশ্বাস
গ্রিনল্যান্ডের জনগণের মধ্যে নতুন চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দেশটির সরকার পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা এরিক ইয়েনসেন জানিয়েছেন, তিনি চুক্তির খসড়া দেখেছেন এবং এতে তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আলোচনাটি সামলাচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকার সীমা। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড বলছে, নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লেও তাদের সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নীতি যে সংকট তৈরি করেছিল, নতুন চুক্তি সেই সংকটকে ন্যাটোর বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা। এতে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার সুযোগ পাবে, অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বেশি জোর দিতে পারবে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ভাষা প্রকাশের পরই অবশ্য পরিষ্কার হবে, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা কতটা বাড়ছে এবং ন্যাটোর ভূমিকা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হচ্ছে। সেই কারণে মঙ্গলবারের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।












