একসময় জার্মান গাড়ি নির্মাতা ভক্সওয়াগনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুনাফার উৎসগুলোর একটি ছিল বিলাসবহুল স্পোর্টস কার ব্র্যান্ড পোর্শে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পোর্শেই এখন ভক্সওয়াগনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর পোর্শের মূল্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান। চীনের বাজারে বিক্রি কমে যাওয়া, বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের ব্যয়বহুল ভুল সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক গাড়ির বাজারের পরিবর্তন—সব মিলিয়ে চাপের মুখে পড়েছে ব্র্যান্ডটি।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে মূল প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগনের ওপর। কোম্পানিটি পোর্শেতে থাকা ৭৫ শতাংশ অংশীদারির মূল্যায়ন থেকে ৬০০ কোটি ইউরো বা প্রায় ৬৯০ কোটি ডলার কমিয়ে দেওয়ার পর চলতি বছরের মুনাফার পূর্বাভাসও বড় ধরনেরভাবে কমিয়েছে। এখন ২০২৬ সালে ভক্সওয়াগনের পরিচালন মুনাফার হার সর্বোচ্চ ১ শতাংশে থাকতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
চার বছর আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একসময়ের ‘কিংবদন্তি’ এখন কেন সংকটে
২০২২ সালে পোর্শের শেয়ারবাজারে প্রবেশ ইউরোপের অন্যতম বড় ও আলোচিত প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির ঘটনা ছিল। সে সময় ব্র্যান্ডটির মুনাফার হার ২০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছিল। পোর্শের ব্র্যান্ড মূল্য, উচ্চমূল্যের গাড়ির চাহিদা এবং বিশেষ করে চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা বিলাসবহুল গাড়ির বাজারকে কেন্দ্র করে ভক্সওয়াগনের প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি।
কিন্তু সেই হিসাব দ্রুত বদলে যায়।
চীনের বাজারে পোর্শের বিক্রি গত চার বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। সেখানে স্থানীয় নির্মাতারা দ্রুত উন্নতি করেছে এবং বৈদ্যুতিক ও বিলাসবহুল গাড়ির বাজারে চীনা প্রতিযোগিতা আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে।
ফলে পোর্শেকে চীনে ডিলারশিপ কমাতে হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ভারতের বাজারেও গাড়ি বিক্রি কমেছে।
অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গাড়িতে দ্রুত রূপান্তরের ক্ষেত্রেও পোর্শে ব্যয়বহুল কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উচ্চমূল্যের গাড়ির ক্রেতাদের প্রত্যাশা, বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদার ওঠানামা এবং নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ—সবকিছু মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
ভক্সওয়াগনের জন্য বড় ধাক্কা
পোর্শের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ভক্সওয়াগনের হিসাবেই।
কোম্পানিটি পোর্শেতে থাকা নিজের অংশীদারির মূল্য থেকে ৬০০ কোটি ইউরো কমিয়েছে। এর আগে মাত্র এক বছর আগেই পোর্শেকে ঘিরে ২৭০ কোটি ইউরোর মূল্যহ্রাস দেখানো হয়েছিল।
সাম্প্রতিক এই মূল্যহ্রাসের ফলে পোর্শের সঙ্গে ভক্সওয়াগনের হিসাবের ‘গুডউইল’ বা ব্র্যান্ডের অতিরিক্ত মূল্য গত বছরের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে প্রায় ১০০০ কোটি ইউরোতে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে পোর্শের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় এই মূল্য ছিল ১৮৮০ কোটি ইউরো।
ভক্সওয়াগনের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগকারী ডেকার ইনগো স্পাইখ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, পুনর্গঠন নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এত বড় মূল্যহ্রাস দেখানো কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার ভঙ্গুরতাই প্রকাশ করছে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের জায়গাটিও সেখানেই—ভক্সওয়াগন যে পুনর্গঠন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত সংকট সামলানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না।
‘পোর্শে আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে’
জার্মান গাড়ি শিল্প বিশ্লেষক ফার্ডিনান্ড ডুডেনহোফারের মতে, পোর্শের মুনাফা-চালক হিসেবে স্বর্ণযুগ শেষ হয়ে গেছে।
‘কম সংখ্যক গাড়ি, কিন্তু বেশি মূল্য’—পোর্শের এই কৌশলকে বলা হয় ‘ভ্যালু ওভার ভলিউম’। অর্থাৎ বেশি গাড়ি বিক্রির পরিবর্তে সবচেয়ে লাভজনক উচ্চমূল্যের মডেলের দিকে নজর দেওয়া।
এই কৌশলে মুনাফার হার কিছুটা ভালো রাখা সম্ভব হলেও মোট মুনাফার পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে ভক্সওয়াগনের বিশাল পুনর্গঠন ব্যয়ের জন্য পোর্শে আগের মতো নগদ অর্থ জোগাতে পারছে না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, পোর্শের মুনাফার হার এখন ভক্সওয়াগন গ্রুপের সামগ্রিক হারের নিচে নেমে গেছে। এমনকি ভক্সওয়াগনের অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী ব্র্যান্ড স্কোডাও এখন লাভের দিক থেকে পোর্শেকে ছাড়িয়ে গেছে।
ফলে ভক্সওয়াগন গ্রুপের ভেতরে পোর্শের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্বাধীন গাড়ি শিল্প বিশ্লেষক ম্যাথিয়াস শ্মিটের ভাষায়, স্কোডাই কার্যত ভক্সওয়াগন গ্রুপের ‘নতুন পোর্শে’ হয়ে উঠেছে।
চীন হারানোর মূল্য
পোর্শের সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে চীন।
একসময় চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত বিলাসবহুল গাড়ির বাজার পোর্শের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। এখন সেই বাজারেই স্থানীয় নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে ব্র্যান্ডটি।
চীনা গাড়ি নির্মাতারা বৈদ্যুতিক গাড়িতে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়েছে। একই সঙ্গে চীনের ভোক্তাদের পছন্দেও পরিবর্তন এসেছে।
ফলে পোর্শের জন্য চীনের বাজারে আগের বিক্রির মাত্রা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও নতুন শুল্কের চাপ রয়েছে। ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অতিরিক্ত শুল্ক পোর্শের লাভের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।
অর্থাৎ একদিকে চীনে বিক্রি কমছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যয় বাড়ছে। এই দুই বাজারের চাপ একসঙ্গে পোর্শের ব্যবসায়িক মডেলের ওপর বড় আঘাত তৈরি করেছে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে কঠিন পরীক্ষা
২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ভক্সওয়াগনের প্রধান নির্বাহী অলিভার ব্লুম একই সঙ্গে পোর্শের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পোর্শের এই দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার সময়টিও তার নেতৃত্বের সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে।
এখন পোর্শের প্রধান নির্বাহী মাইকেল লাইটার্স ব্র্যান্ডটির পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।
তিনি পোর্শের মধ্যমেয়াদি মুনাফার হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবে কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বাজারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বিশেষ করে গাড়ির বিক্রি কমে গেলে শুধু বেশি লাভের মডেল বিক্রি করে দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ তৈরি করা কঠিন। ভক্সওয়াগনের বিশাল পুনর্গঠন কর্মসূচি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও তাই পোর্শের বিক্রয় গুরুত্বপূর্ণ।
জার্মান অটোমোটিভ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাম-এর স্টেফান ব্রাৎসেলের মতে, পোর্শের ওপর এখন চাপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। শুধু খরচ কমিয়ে ভক্সওয়াগনকে এই সংকট থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে না।
শুধু পোর্শে নয়, পুরো জার্মান গাড়ি শিল্পই চাপে
পোর্শের সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগও কম। এটি আসলে জার্মানির পুরো গাড়ি শিল্পের বৃহত্তর সমস্যার একটি প্রতিচ্ছবি।
ভক্সওয়াগন জার্মানির বিভিন্ন কারখানায় বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই ও ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছে। এর প্রতিবাদে হাজার হাজার কর্মী সোমবার বিভিন্ন কারখানায় বিক্ষোভ করেছেন।
একই সময়ে মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউও জার্মানিতে কর্মীসংখ্যা কমানোর পথে হাঁটছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে জার্মান গাড়ি শিল্পের শ্রমিক সংগঠনগুলো চীনের তুলনামূলক সস্তা গাড়ির আমদানি ঠেকাতে আরও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
কিন্তু বাণিজ্যিক সুরক্ষা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ চীনা প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জার্মান নির্মাতাদের সামনে রয়েছে প্রযুক্তিগত রূপান্তর, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের মতো একাধিক চাপ।
ভক্সওয়াগনের বড় লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত
ভক্সওয়াগন চলতি দশকের শেষ নাগাদ পরিচালন মুনাফার হার ৯ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই হার সর্বোচ্চ ১ শতাংশ হতে পারে বলে কোম্পানির বর্তমান পূর্বাভাস।
এই ব্যবধানই সংকটের গভীরতা বোঝায়।
কোম্পানির পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যাপক ব্যয় কমানো, কর্মীসংখ্যা হ্রাস এবং ব্যবসার কাঠামো নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু পোর্শের মতো একসময়ের শক্তিশালী মুনাফা-উৎস যদি এখন নিজেই নগদ অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে পুরো পরিকল্পনাটিই আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এই সংকট ভক্সওয়াগনের জন্য অন্য একটি সুযোগও তৈরি করতে পারে। পোর্শের প্রত্যাশিত আয় এতটা কমে যাওয়া কোম্পানির নেতৃত্বকে আরও গভীর ব্যয়সংকোচন ও পুনর্গঠনের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।
অর্থাৎ যে ব্র্যান্ড একসময় ভক্সওয়াগনের শক্তির প্রতীক ছিল, সেটিই এখন কোম্পানির কঠিন বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পোর্শের সামনে তাই শুধু বিক্রি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; একই সঙ্গে নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল, চীনের বাজারে অবস্থান, বৈদ্যুতিক গাড়িতে বিনিয়োগ এবং উচ্চমূল্যের মডেলনির্ভর কৌশল—সবকিছুকেই নতুন করে যাচাই করতে হবে।
ভক্সওয়াগনের জন্য প্রশ্নটি আরও বড়: পোর্শেকে আবার আগের মতো মুনাফার ইঞ্জিনে পরিণত করা সম্ভব হবে, নাকি একসময়ের ‘কিংবদন্তি’ ব্র্যান্ডটি ভবিষ্যতে গ্রুপের জন্য দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক বোঝা হয়েই থাকবে?












