ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে আবারও কূটনৈতিক আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার দুই দেশের পক্ষ থেকেই আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর এই প্রথম একই সময়ে দুই নেতা জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নিতে যাচ্ছেন। রোববার ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি আগ্রহী।
আলোচনায় ফেরার সুযোগ
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের সরাসরি বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। তবে ইরানি প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করলে তেহরান সাত দিনের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে পারে। গত সপ্তাহেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইরানি কর্মকর্তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে এবং এরপর আলোচনার অগ্রগতির সময়সূচি নির্ধারণ করতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকে তিনি কূটনীতিতে ফেরার ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও আলোচনার দরজা খোলা রাখার কথা জানিয়েছেন। এনবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কোনো আলোচনা ইতিবাচক ফল এবং শেষ পর্যন্ত সংকট সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করলে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত।
তবে দুই পক্ষের অবস্থানে কঠোরতাও রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। তার বক্তব্য, ইরানের জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিজের শক্তি চাপিয়ে দিতে পারবে না।
হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় উদ্বেগ
ট্রাম্প মঙ্গলবার বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে আগ্রহী হলেও ইরানের হাতে অতিরিক্ত প্রভাব চলে যাওয়া নিয়েও উদ্বিগ্ন।
ওমান ছাড়া এসব দেশের সবগুলোতেই বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। চলমান যুদ্ধে এসব স্থাপনাও ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
সৌদি আরবের ওপর হুতিদের চাপ
ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনীকে পিছু হটিয়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এতে সৌদি আরবের লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি নিয়েও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে মঙ্গলবার তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব তার পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে এবং লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে সীমিত পরিসরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেল রপ্তানি শুরু করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজনিত বাধা এড়াতে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট। চলতি মাসে ইরানের মিত্র ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর হামলার অভিযোগের পর পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
কাতারের নিরাপত্তা প্রস্তাব
ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠকে কাতারের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। এতে ইরান ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। আঞ্চলিক একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বলেছেন, এ ধরনের ব্যবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তার মতে, বারবার উত্তেজনা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা, হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় এখন একই কূটনৈতিক সমীকরণে চলে এসেছে। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে দুই পক্ষের যোগাযোগ সেই সমীকরণে নতুন কোনো অগ্রগতি আনে কি না, সেদিকেই নজর থাকবে।












