পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আফগানিস্তানে থাকা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির (টিটিপি) তৎপরতা নিয়ে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই গভীর হয়েছে। চীনের মধ্যস্থতার চেষ্টাও এখন পর্যন্ত এই সংকটের দৃশ্যমান সমাধান আনতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্য নতুন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সামনে এসেছে—আফগানিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান সীমান্ত বেড়ার ভেতরের দিকে আরও একটি সমান্তরাল বেড়া নির্মাণ।
সেপ্টেম্বর ১৬-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে রেজা খান লিখেছেন, আফগান তালেবান টিটিপিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা থেকে পাকিস্তান ও চীনের খুব বেশি কিছু আশা করা উচিত নয়। তাঁর যুক্তি, কাবুল সাময়িকভাবে টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করলেও সেটি পাকিস্তানের কাছ থেকে সীমান্ত খুলে দেওয়া বা অন্য কোনো ছাড় আদায়ের কৌশল হতে পারে।
বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত, যা ডুরান্ড লাইন নামে পরিচিত, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ রয়েছে। টিটিপির বড় ধরনের হামলা এবং আফগান ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের অভিযোগের পর ইসলামাবাদ সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। তবে সীমান্ত বন্ধ করেও সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবির বক্তব্যও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, চীনের ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগকে ইসলামাবাদ স্বাগত জানালেও বাইরের কোনো মধ্যস্থতা কাবুলের পক্ষ থেকে টিটিপি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের বিকল্প হতে পারে না। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে বাস্তব ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সীমান্তের বেড়া নিয়েও বড় সমস্যা
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বড় অংশজুড়ে পাকিস্তান ইতোমধ্যে বেড়া নির্মাণ করেছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়া এখনও অক্ষত থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় ভাঙা বা অপসারিত অংশ দিয়ে অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তান ২০১৬ সালে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করে এবং ২০২১ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার এলাকায় কাজ শেষ করে। বাকি প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকায় কাজ করার ক্ষেত্রে তৎকালীন আফগান তালেবান সরকারের সম্মতির প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে আফগান তালেবান সীমান্ত বেড়ার বিরোধিতা করে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তালেবান যোদ্ধারা বিভিন্ন সময়ে বেড়া সরিয়ে ফেলার হুমকিও দিয়েছে। ফলে পাকিস্তানের নির্মিত সীমান্ত ব্যবস্থার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে অনুপ্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কেন দ্বিতীয় বেড়ার প্রস্তাব?
এই পরিস্থিতিতে সামরিকভাবে আফগানিস্তানের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে হামলা না করে পাকিস্তানের ভূখণ্ডের ভেতরেই আরেকটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবটির মূল ধারণা হলো, বিদ্যমান সীমান্ত বেড়ার কিছুটা ভেতরে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে আরেকটি সমান্তরাল বেড়া নির্মাণ করা। এতে প্রথম স্তরের বেড়া কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দ্বিতীয় স্তরটি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অতিরিক্ত বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিশ্লেষকের মতে, প্রথমবারের মতো পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণের তুলনায় দ্বিতীয় স্তরের বেড়া তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। তবে এর জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য নয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষেত্রেও কাজে আসতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে মানুষ ও পণ্য চলাচলকে নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত পথের মধ্যে নিয়ে আসা গেলে অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালান কমানো সম্ভব হতে পারে।
সীমান্ত বন্ধ থাকলেই কি সমাধান?
পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা হলো, সীমান্ত বন্ধ করার পরও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে টিটিপির হামলা নিয়ে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
বিশ্লেষণে আরও দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত এলাকায় টিটিপির সঙ্গে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর সহযোগিতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের আন্তঃগোষ্ঠী সহযোগিতার দাবিগুলো রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পাকিস্তানের জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা তাই শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্বের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্য, অভিবাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চলাচলের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন
বিশ্লেষণে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সীমান্ত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি প্রণয়ন রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত। এমনকি সীমান্তে দ্বিতীয় স্তরের বেড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত সংসদের মাধ্যমেও নেওয়া যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের পেশোয়ারের ভয়াবহ স্কুল হামলার পর পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান বা জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। ২০ দফার ওই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
লেখকের যুক্তি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা তৈরি হলে নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়েও রাজনৈতিক সরকারের সুস্পষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন।
বেড়া নির্মাণে বিরোধিতাও আছে
তবে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে আরও একটি স্তরের বেড়া নির্মাণের ধারণাটি সর্বসম্মত নয়। আফগান তালেবান শুরু থেকেই সীমান্ত বেড়ার বিরোধিতা করে আসছে। পাকিস্তানের ভেতরেও কয়েকটি রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী এই সীমান্ত ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে।
বিশ্লেষণে পাকিস্তানের আওয়ামি ন্যাশনাল পার্টি বা এএনপি, পশতুনখাওয়া মিলি আওয়ামী পার্টি বা পিকেএমএপি, জামায়াতে ইসলামী এবং কিছু উপজাতীয় সংগঠনের বিরোধিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের আপত্তির পেছনে সীমান্ত, পশতুন জনগোষ্ঠীর চলাচল এবং ডুরান্ড লাইনকে ঘিরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের বড় একটি অংশের মানুষ সীমান্তে বেড়া রাখার পক্ষে। বিশেষ করে সন্ত্রাসী হামলা বন্ধ ও সীমান্ত দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ঠেকানোর দাবির সঙ্গে এই অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু নিরাপত্তা নয়, বাণিজ্যও গুরুত্বপূর্ণ
দ্বিতীয় স্তরের বেড়ার প্রস্তাবের অন্যতম যুক্তি হলো সীমান্তকে আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বৈধ বাণিজ্য এবং মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত পারাপার ও চোরাচালান রয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈধ পণ্য ও মানুষের চলাচল আরও স্বচ্ছ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের জন্য আনা পণ্য পাকিস্তানের বাজারে অবৈধভাবে প্রবেশের মতো সমস্যাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
এ কারণে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় স্তরের বেড়াকে শুধু একটি নিরাপত্তা অবকাঠামো হিসেবে না দেখে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বড় ব্যয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য
আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্তে দ্বিতীয় স্তরের বেড়া নির্মাণ নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের জন্য বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রকল্প হবে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, দীর্ঘ সীমান্ত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নজরদারি—সব মিলিয়ে এর বাস্তবায়ন সহজ নয়।
তারপরও বিশ্লেষণে এটিকে পাকিস্তানের জন্য একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উদ্দেশ্য আফগানিস্তানকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং সীমান্তের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র অনুপ্রবেশ ঠেকানো, মানুষ ও পণ্যের বৈধ চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং আফগানিস্তানের সংঘাতের প্রভাব পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়া কমানো।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের সংকট শুধু বেড়া দিয়ে সমাধান করা সম্ভব কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। সীমান্ত অবকাঠামোর পাশাপাশি কাবুলের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, বৈধ বাণিজ্য ও সীমান্তপারের মানুষের চলাচল—সবকিছুকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। দ্বিতীয় স্তরের বেড়া সেই বৃহত্তর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার একটি সম্ভাব্য অংশ হতে পারে।












