যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালের এই হামলায় অন্তত দুজন নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কিয়েভের নগর কর্তৃপক্ষ।
হামলায় রাজধানীর রেল অবকাঠামো, গুদাম, ব্যবসায়িক স্থাপনা ও জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় এবং আকাশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। চলতি গ্রীষ্মে কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলার মধ্যে বুধবারের হামলাকে সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ক্যাটারিনা ম্যাথারনোভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হামলার সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের কার্যালয়ের জানালা দিয়ে কাছাকাছি ভবনগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, একটি ড্রোন নয়তলা একটি বাণিজ্যিক ভবন, একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র এবং কয়েকটি গুদামে আঘাত হানে। হামলার ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগুন ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ইউক্রেনের জ্বালানি কোম্পানি উক্রনাফতা জানিয়েছে, রাজধানীতে তাদের একটি পেট্রল স্টেশনেও হামলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে এটি তাদের ষষ্ঠ পেট্রল স্টেশন, যেটি রুশ হামলার লক্ষ্যবস্তু হলো। নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোট দুটি পেট্রল স্টেশন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে ব্যস্ত একটি সড়কের পাশে থাকা একটি পেট্রল স্টেশনকে ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখা যায়।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ওলেক্সান্দর পের্তসভস্কি জানান, কিয়েভের রেল অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী আহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিল
রাশিয়ার হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে কথা হয়।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধে একটি দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠক থেকে কোনো সমঝোতা হয়নি।

তিনি বলেন, মস্কো ইউক্রেনের অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করলে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতিতে তিনি রাজি। একই সঙ্গে আসন্ন শীতের আগে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য বড় ধরনের রুশ হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন তিনি।
ইউক্রেনের আশঙ্কা, শীত মৌসুমে রাশিয়া দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা কিয়েভের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে সংশয়
জেলেনস্কি জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও ইউক্রেনের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী মাইকোলা নেচিপুরেঙ্কো বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সবসময়ই হুমকির মধ্যে থাকবে। তার মতে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের কোনো সমঝোতা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, যুদ্ধ চলার সময় কোনো পক্ষের মধ্যে স্থায়ীভাবে কিছুতে একমত হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
এদিকে বুধবার ক্রেমলিন জানিয়েছে, ইউক্রেনের সঙ্গে ভবিষ্যতে শান্তি আলোচনা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। মস্কোর পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠকেরও পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়েছে।
ফলে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকে শান্তি প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হওয়ার পরপরই কিয়েভে রাশিয়ার বড় ধরনের ড্রোন হামলা সংঘাতের বর্তমান বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে রুশ হামলা অব্যাহত রয়েছে।












