মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। হংকংভিত্তিক সংবাদপত্র সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারটি সিসিটিভির উইচ্যাট অ্যাকাউন্টে প্রচারিত হয়েছে। মাস্ক বলেন, “তাঁকে একজন দারুণ নেতা মনে হয়। তাঁর সময়ে চীন বিপুল সমৃদ্ধি পেয়েছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।” তিনি আরও বলেন, রাস্তায় হাঁটলেই বোঝা যায়, সাধারণ চীনা নাগরিকের সমৃদ্ধি অনেক বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, শি “স্পষ্টতই চমৎকার কাজ করেছেন এবং খুবই সক্ষম”। সাক্ষাৎকারে তিনি চীনের এআই সক্ষমতারও প্রশংসা করেন। কোন প্রসঙ্গে এবং কবে সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। শির ওয়াশিংটন সফরের ঠিক আগে এই ইলন মাস্কের প্রশংসা স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে।
মাস্কের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গভীর। তাঁর বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলার সবচেয়ে বড় বিদেশি কারখানা সাংহাইয়ে। চীন টেসলার অন্যতম বড় বাজারও। অন্যদিকে মাস্ক রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সেরও মালিক। স্পেসএক্স মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ও গোয়েন্দা সংস্থার বড় ঠিকাদার। সামরিক উপগ্রহ উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে স্পর্শকাতর নানা কাজে প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত। এই দুই ভূমিকার কারণে ওয়াশিংটনে বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রশ্ন উঠছে। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীরে এবং চীনের বাজারে গভীরভাবে যুক্ত থাকলে স্বার্থের সংঘাত হয় কি না, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রে। নতুন সাক্ষাৎকার সেই বিতর্ক আবার উসকে দিয়েছে। ইলন মাস্কের প্রশংসা তাই শুধু একজন ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত মত হিসেবে দেখা কঠিন। টেসলার সাংহাই কারখানা আর স্পেসএক্সের মার্কিন সরকারি চুক্তি, দুটিই তাঁর ব্যবসার বড় স্তম্ভ।
সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। শি এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আলোচনার বড় বিষয় এআই ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা। মার্কিন প্রশাসন চীনে উন্নত চিপ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। মার্কিন এআই কোম্পানিগুলোর অনেক শীর্ষ নির্বাহী চীনকে এআই দৌড়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। এমন সময়ে মার্কিন প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে পরিচিত মুখের কাছ থেকে চীনা এআইয়ের প্রশংসা বেইজিংয়ের জন্য প্রচারের বড় সুযোগ। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে বলছে, এআই দৌড় থামানোর মার্কিন আহ্বান আসলে চীনকে আটকে রাখার কৌশল। ইলন মাস্কের প্রশংসা সেই বয়ানে নতুন রসদ জোগাল।
বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও মাস্ক পরিচিত নাম। তাঁর উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক বাংলাদেশে চালু হয়েছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানির মালিকেরা যখন ভূরাজনীতির দুই প্রান্তে একসঙ্গে পা রাখেন, তখন ছোট দেশগুলোর জন্য প্রশ্ন ওঠে। তাদের ডিজিটাল অবকাঠামো কতটা নিরপেক্ষ থাকবে? যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দুই দিক থেকেই সেবা ও বিনিয়োগ নিচ্ছে। সেই ভারসাম্য রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকার বিষয়টি এমন ঘটনায় আবার সামনে আসে। কোনো প্রযুক্তি সেবাদাতার মালিকের ভূরাজনৈতিক অবস্থান বদলালে সেবার শর্তও বদলাতে পারে। তাই বিকল্প ও নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে মাস্ক বলেছেন, চীনের সমৃদ্ধি তিনি “নিজের চোখে” দেখেছেন। একই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে শির লাল গালিচার পাশে দাঁড়িয়ে মার্কিন কর্মকর্তারাও নিজের চোখে দেখবেন, প্রযুক্তির দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী কতটা এগিয়েছে।












