স্পেসএক্সের বিশাল রকেট স্টারশিপ প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছেছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের স্টারবেস থেকে ১৪তম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে রকেটটি কক্ষপথে পৌঁছে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইটও মহাকাশে স্থাপন করেছে।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। উড্ডয়নের পর স্টারশিপের তিনটি প্রধান ইঞ্জিনের একটি আগেভাগে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পরিকল্পিত ১০ ঘণ্টার মিশন কমিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টায় শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় স্পেসএক্স।
ইঞ্জিন বন্ধ হলেও কক্ষপথে পৌঁছাল স্টারশিপ
স্টারশিপের নিচের অংশে থাকা সুপার হেভি বুস্টার রকেটটিকে মহাকাশের দিকে তুলে দেওয়ার পর আলাদা হয়ে যায়। এরপর মূল স্টারশিপ অংশটি নিজস্ব ইঞ্জিনে এগিয়ে যেতে থাকে।
এই পর্যায়েই একটি প্রধান ইঞ্জিন নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে স্পেসএক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এই সমস্যার কারণে স্টারশিপের কক্ষপথে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল হতে পারে।

কিন্তু কয়েক মিনিট পর প্রকৌশলীরা নিশ্চিত করেন, অন্য ইঞ্জিন ব্যবহার করে স্টারশিপ এখনও কক্ষপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টাই সফল হয়।
এটি স্টারশিপ কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২৩ সালে পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন শুরু হওয়ার পর আগের ১৩টি মিশনই মূলত উপকক্ষপথে সীমাবদ্ধ ছিল।
২৬টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট স্থাপন
কক্ষপথে পৌঁছানোর পর স্টারশিপ প্রায় ২৬৯ কিলোমিটার উচ্চতায় একে একে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক স্যাটেলাইট স্থাপন করে।
এগুলো স্টারশিপের মাধ্যমে কক্ষপথে পাঠানো প্রথম কার্যকর স্যাটেলাইট। ফলে সোমবারের মিশনটি শুধু প্রযুক্তি পরীক্ষাই ছিল না, এটি স্পেসএক্সের জন্য প্রথম আয়-সংশ্লিষ্ট স্টারশিপ মিশনও হয়ে উঠেছে।
স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ২৬টি স্টারলিংক ভি৩ স্যাটেলাইটই নির্ধারিত কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
নতুন ভি৩ স্যাটেলাইটগুলো আগের ভি২ মিনি স্যাটেলাইটের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য পরিবহনে সক্ষম। স্পেসএক্সের হিসাবে, প্রতিটি ভি৩ স্যাটেলাইট আগের প্রজন্মের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি তথ্য পরিচালনা করতে পারে।
বর্তমানে ফ্যালকন ৯ রকেট ব্যবহার করে একসঙ্গে সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়। ভবিষ্যতে স্টারশিপ নিয়মিত কার্যক্রমে গেলে একবারে প্রায় ৬০টি ভি৩ স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কেন স্টারশিপ এত গুরুত্বপূর্ণ
স্টারশিপকে এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে রকেটের প্রায় সব অংশই পুনর্ব্যবহারযোগ্য হয়। এর লক্ষ্য মহাকাশে উৎক্ষেপণের খরচ কমানো এবং আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন মহাকাশযান পাঠানো।
স্পেসএক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে স্টারশিপের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক স্টারলিংক স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে এটি নাসার চাঁদে মানুষ পাঠানোর কর্মসূচিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তাই কক্ষপথে পৌঁছানো স্টারশিপ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান পরীক্ষা ছিল। তবে ইঞ্জিন সমস্যাটি দেখিয়ে দিয়েছে, নিয়মিত বাণিজ্যিক ও মানববাহী মিশনের আগে প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতার আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
বিশেষ করে মহাকাশে স্টারশিপের ইঞ্জিনের নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও চাঁদে নভোচারী পাঠানোর মতো জটিল অভিযানে একই ধরনের সমস্যা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সুপার হেভি বুস্টারেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
স্টারশিপের সঙ্গে থাকা সুপার হেভি বুস্টার রকেটটি মূল মহাকাশযানকে ওপরে তুলে দেওয়ার পর আলাদা হয়ে যায়। এরপর এটি নিয়ন্ত্রিতভাবে মেক্সিকো উপসাগরের পানিতে অবতরণ করে।
এর আগে দুটি মিশনে সুপার হেভি বুস্টার কঠিন অবতরণ করেছিল। এবার নিয়ন্ত্রিতভাবে পানিতে নামতে পারা বুস্টারের পরিচালনক্ষমতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে মূল স্টারশিপ কক্ষপথে কাজ শেষ করার পর প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ন্ত্রিতভাবে নেমে আসে। পানিতে পড়ার সময় রকেটটির নিচের অংশে আগুন দেখা যায় এবং পরে এটি এক পাশে কাত হয়ে যায়। মিশনের অংশ হিসেবেই মহাকাশযানটি সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল না।
১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের কর্মসূচি
স্টারশিপ কর্মসূচির উন্নয়নে এখন পর্যন্ত স্পেসএক্সের ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইলন মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে স্টারশিপকে ভবিষ্যতের উচ্চগতির মহাকাশ পরিবহনের ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। তার লক্ষ্য একসময় বছরে শত শত, এমনকি হাজারের বেশি স্টারশিপ মিশন পরিচালনা করা।
মাস্কের মতে, স্টারশিপ প্রতি ঘণ্টায় একটি করে উড্ডয়নের সক্ষমতায় পৌঁছাতে এখনও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু কক্ষপথে পৌঁছানো নয়, একই সঙ্গে দ্রুত পুনঃব্যবহার, নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন, নিরাপদ অবতরণ এবং নিয়মিত উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
স্টারলিংকের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণেও বড় ভূমিকা
স্টারশিপের সফল কক্ষপথযাত্রার আরেকটি বড় গুরুত্ব রয়েছে স্পেসএক্সের স্টারলিংক ব্যবসার জন্য।
বিশ্লেষকদের হিসাবে, নতুন ভি৩ স্যাটেলাইটগুলো স্টারলিংক নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত আয় তৈরি করতে পারে। ফলে স্টারশিপ শুধু মহাকাশ গবেষণার প্রকল্প নয়, স্পেসএক্সের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সোমবারের উৎক্ষেপণের পর স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়। এতে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা সাফল্যের পাশাপাশি ইঞ্জিন সমস্যাটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
স্টারশিপের সফল কক্ষপথে পৌঁছানো তাই একদিকে স্পেসএক্সের বহু বছরের প্রচেষ্টার বড় অর্জন, অন্যদিকে এটিও স্পষ্ট করেছে যে মহাকাশযানটিকে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী করতে এখনও বেশ কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।












