আফগানিস্তানের দুটি স্থানে সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানোর দাবি করেছে পাকিস্তান। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ২২ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। হামলায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘সুপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত’ এসব বিমান হামলা চালানো হয়। ‘গজব লিল-হক’ অভিযানের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানের দুটি স্থানে থাকা সন্ত্রাসীদের ক্যাম্প ও গোপন আস্তানায় হামলা চালানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব ঘাঁটি ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’, ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ ও তাদের সহযোগীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। হামলায় লক্ষ্যবস্তুগুলো নির্ভুলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ২২ জন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়।
হামলায় সন্ত্রাসীদের মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও ধ্বংস হয়েছে বলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান সবসময় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। তবে দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তান এখনো সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দেশটির জন্য সন্ত্রাসী হুমকির উৎস আফগান ভূখণ্ড।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, হামলার সময় বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’ কর্মসূচির আওতায় যে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে, তা অব্যাহত থাকবে।
এর আগে গত সপ্তাহেও আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছিল পাকিস্তান। আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানে ড্রোন হামলার চেষ্টার জবাবে ওই অভিযান চালানো হয়েছিল বলে ইসলামাবাদ জানিয়েছিল।
২৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ড্রোন উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত স্থাপনা। পাকিস্তান ওই অভিযানকে ‘পরিকল্পিত, নির্ভুল, নিয়ন্ত্রিত ও আনুপাতিক’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে।
এর আগে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছিল দেশটি। নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছিল, চারটি ড্রোন তোরখাম সীমান্তের কাছে এবং আরও চারটি কোহাটের পার্বত্য এলাকায় ধ্বংস করা হয়।
আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো এবং সেখানে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর ঘাঁটি থাকার অভিযোগ নিয়ে তালেবান সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে ইসলামাবাদের। পাকিস্তান বারবার কাবুলকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
বেলুচিস্তানেও অভিযান, নিহত ৬
এদিকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের কাচ্চি জেলায় পৃথক এক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ছয়জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নিরাপত্তা সূত্র।
সূত্রের দাবি, কাচ্চি জেলার সানি এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’-এর সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ‘রদ্দ-উল-ফিতান ৩’ অভিযানের আওতায় পরিচালিত এই অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এলাকায় আরও কোনো সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর ওয়াজিরিস্তানেও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। সেখানে কয়েকটি সন্ত্রাসী আস্তানা ও সুড়ঙ্গ ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সহায়তায় বিস্ফোরক উপকরণগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের অভিযানে একাধিক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সীমান্তপারের সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে দাবি করে আসছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। তবে কাবুল এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।
দুই দেশের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা হলেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বিরোধের সমাধান হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ‘গজব লিল-হক’ অভিযান শুরু করে। এরপরও ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। আফগান ভূখণ্ডে সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেখান থেকে হামলার অভিযোগ এখনো দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধের কারণ হয়ে আছে।












