ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দুই শহর ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কে রুশ হামলা ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইউক্রেনীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব শহর স্থলপথে দখল করতে রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলোকে এখন ধারাবাহিক বোমা ও ড্রোন হামলায় বসবাসের অযোগ্য করে তোলার চেষ্টা চলছে।
ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্ক ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রুশ বাহিনী এখনো শহর দুটির সরাসরি দখল নেওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছায়নি। তবে দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র, গাইডেড বোমা ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছে। এতে শহরগুলোর আবাসিক এলাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হামলার পর উদ্ধারকর্মীদের কাজও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রামাতোরস্কে পুলিশ প্যারামেডিক ইউনিটের নেতৃত্ব দেওয়া ওলেক্সান্দর চিভেনকভ জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তারা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যান না। প্রথম বিস্ফোরণের পর আরও হামলা হতে পারে কি না, তা সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন তারা। এরপর ভারী সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকর্মীদের অভিজ্ঞতায়, প্রথম বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসা মানুষ ও জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয় দফা হামলা হতে পারে। তাই প্রতিটি অভিযানেই তাদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
চিভেনকভ চার বছরের বেশি সময় ধরে উদ্ধারকাজে যুক্ত। এর আগে পোকরভস্ক, তোরেৎস্ক ও আভদিভকার মতো শহরে রুশ হামলার পর ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছেন তিনি। তার মতে, একই ধরনের ধ্বংসের চিত্র এখন ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কেও দেখা যাচ্ছে।
হামলার পর উদ্ধারকাজ অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের জরুরি চিকিৎসার মতো হয়ে উঠেছে। উদ্ধারকর্মীরা প্রথমে সবচেয়ে গুরুতর আহতদের শনাক্ত করেন, ঘটনাস্থলেই তাদের অবস্থা স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন এবং দ্রুত হাসপাতালে পাঠান। এরপর আবার ফিরে যান নতুন আহতদের উদ্ধারে।
চিভেনকভ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে করতে তার আবেগ অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে গেছে। উদ্ধারকর্মীদের ওপর অন্যদের জীবন নির্ভর করে বলে হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
গ্রীষ্মজুড়ে রুশ হামলা বাড়তে থাকায় ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কের আরও বিস্তৃত এলাকায় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এখন যারা শহর দুটিতে রয়ে গেছেন, তাদের বড় একটি অংশ বয়স্ক মানুষ, শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম ব্যক্তি কিংবা জরুরি সেবা চালু রাখার সঙ্গে যুক্ত পৌর কর্মী।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্ক মিলিয়ে এখনো প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডনবাসের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকায় মোট প্রায় ৯৩ হাজার বেসামরিক মানুষ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি শিশু।
উদ্ধারকর্মীদের উদ্বেগের বড় কারণ শিশুদের উপস্থিতিও। চিভেনকভ বলেন, অনেক বাবা-মা এখনো সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান উপেক্ষা করছেন। ফলে ছোট শিশুরাও নিয়মিত গোলাবর্ষণের মধ্যে শহরের রাস্তায় চলাফেরা করছে।
শহর দুটিতে এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ওপর ড্রোন প্রতিরোধে জাল টাঙানো হয়েছে। দোকান ও গ্যাস স্টেশনের সামনে বালুর বস্তা রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও বসানো হয়েছে কাঁটাতার। বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, ব্যাংক, ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগের মতো জরুরি সেবা এখনো চালু আছে, তবে নিয়মিত হামলার মধ্যেই এসব ব্যবস্থা সচল রাখতে হচ্ছে।
গাইডেড বোমা, রকেটের মাধ্যমে নিক্ষেপ করা ক্লাস্টার অস্ত্র এবং ছোট আকারের ড্রোন শহরগুলোর দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিয়েছে। একসময় পরিচিত ও ব্যস্ত রাস্তাগুলো এখন যে কোনো মুহূর্তে হামলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। অনেক বাসিন্দার জীবন এখন মূলত ঘর ও ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

স্লোভিয়ানস্ক ছেড়ে যাওয়া ৬১ বছর বয়সী ওলহা ভলোদিমিরিভনা জানান, গ্রীষ্মের সময় পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ হচ্ছিল। নিয়মিত বিমান হামলার সতর্কসংকেত, ড্রোনের শব্দ এবং বিস্ফোরণের কারণে তিনি আর সেখানে থাকা সম্ভব মনে করেননি।
তার স্বামী শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হবে—সামরিক সদস্যরা তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি স্লোভিয়ানস্ক ছেড়ে চলে যান।
তার ভাষায়, দ্রুতগতির ড্রোনের সামনে পালানোর সুযোগও অনেকের থাকে না। ফলে হামলা শুরু হলে কোথাও নিরাপদে সরে যাওয়ার সময় পাওয়া যাবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
গাইডেড বোমার আতঙ্ক আরও ভয়াবহ। অনেক সময় রাতে এসব বোমা হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের আগে আকাশে দ্রুতগতির শিসের মতো শব্দ শোনা গেলেও সতর্ক হওয়ার সময় খুব কম থাকে। শক্তিশালী এসব বোমার আঘাতে ছয়তলা আবাসিক ভবনও ধসে পড়তে পারে।
স্লোভিয়ানস্কের ২৭ বছর বয়সী অগ্নিনির্বাপক কর্মী সেরহি চেপিগার অভিজ্ঞতাও দেখাচ্ছে, গত এক বছরে শহরগুলোর পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে। উদ্ধারকর্মীদের দাবি, জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও হামলার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা বলছেন, জরুরি সেবাকর্মী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলার ফলে শুধু ভবন নয়, একটি শহরকে বসবাসযোগ্য রাখার পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা ও উদ্ধারসেবা ব্যাহত হলে সাধারণ মানুষের শহরে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে যায়।
ক্রামাতোরস্ক ও স্লোভিয়ানস্কে এখনো রুশ স্থলবাহিনীর সরাসরি বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়নি। এসব শহর দখল করতে হলে দীর্ঘ সময়ের স্থলযুদ্ধ এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে। এর পরিবর্তে দূর থেকে হামলা চালিয়ে শহরগুলোর অবকাঠামো ও জনজীবনকে ধীরে ধীরে বিপর্যস্ত করার কৌশলই এখন বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শীত আবারও সামনে। সেই সঙ্গে হামলা অব্যাহত থাকার আশঙ্কায় শহর দুটির বাসিন্দাদের উদ্বেগও বাড়ছে। যারা এখনো সেখানে রয়েছেন, তাদের অনেকের কাছে প্রতিদিনের জীবন মানেই পরবর্তী বিস্ফোরণের অপেক্ষা, আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত পালানোর অনিশ্চয়তা।












