আল-আলামিনে মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ার নেতাদের বৈঠককে সরাসরি নতুন কোনো সামরিক জোটের সূচনা হিসেবে দেখলে এর কূটনৈতিক তাৎপর্য কিছুটা সরলীকরণ করা হবে। বৈঠকটির গুরুত্ব বরং অন্য জায়গায়। নীলনদ অববাহিকা, লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকা—এই তিন কৌশলগত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে চার দেশ নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয়ের একটি কাঠামো গড়ে তোলার দিকে এগিয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যবর্ষীয় সমন্বয় বৈঠককে ঘিরে আল-আলামিনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মিসর ৩ অক্টোবর বৈঠকটি আহ্বানের ঘোষণা দিয়েছিল এবং প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি অন্য তিন নেতাকে আমন্ত্রণ জানান। ফলে এটি আকস্মিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ছিল না। তবে এর প্রস্তুতি ঠিক কত আগে থেকে শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো তথ্য নেই।
বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফল হলো, চার দেশ নিজেদের সম্পর্ককে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং কিছু অভিন্ন নীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে তুলছে।
জোটের বদলে সমন্বয়ের কাঠামো

চার দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, যৌথ সামরিক কমান্ড কিংবা সম্মিলিত সামরিক পদক্ষেপের কোনো অঙ্গীকার নেই। বরং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ, বিকল্প বা সমান্তরাল সরকার প্রত্যাখ্যান, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে তাদের অবস্থানের মধ্যে মিল তৈরি হয়েছে।
সুদান প্রসঙ্গে এই অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চার দেশ সুদানের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে সমান্তরাল কোনো শাসনব্যবস্থা এবং ভাড়াটে যোদ্ধাদের সমর্থনের বিরোধিতা করেছে।
তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না যে তারা সুদানের সশস্ত্র বাহিনীকে একমাত্র বৈধ সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাদের অবস্থানটি বিস্তৃত—সুদানকে একক রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে পড়তে বা বিকল্প কাঠামো দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে দেওয়া যাবে না।
সোমালিয়া প্রসঙ্গেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান দেখা যায়। সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে। তথাকথিত সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি বা সহায়তার বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকান ইউনিয়ন ট্রানজিশন মিশন ইন সোমালিয়ার জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব ধীরে ধীরে সোমালিয়ার নিজস্ব বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো জোট নয়
এখানেই আল-আলামিনের সমীকরণের সূক্ষ্ম দিকটি স্পষ্ট হয়। চার দেশের এই সমন্বয়কে ইথিওপিয়াবিরোধী জোট হিসেবে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
আল-আলামিন বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগে, ২৯ সেপ্টেম্বর, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ আদ্দিস আবাবায় ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও হর্ন অব আফ্রিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। আল-আলামিন বৈঠকের পর সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট ইথিওপিয়াকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য সোমালিয়ার দুই বা তিনটি বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগ্রহের কথাও জানান। তবে তা হতে হবে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এবং সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের অধীনে।

মিসরও বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রবেশাধিকারের মধ্যে পার্থক্য করছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি বলেছেন, ইথিওপিয়ার বাণিজ্যিকভাবে লোহিত সাগরে প্রবেশের বিষয়ে মিসরের আপত্তি নেই; আপত্তি রয়েছে সামরিক প্রবেশাধিকারে।
অর্থাৎ বিরোধটি ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সেই প্রবেশাধিকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে।
লোহিত সাগর ও নীলনদে অভিন্ন অবস্থান
আল-আলামিনের ঘোষণায় লোহিত সাগর নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে এসেছে। চার দেশ নৌ চলাচলের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে বলেছে—লোহিত সাগরের শাসন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এর উপকূলবর্তী দেশগুলোর।
এখানে ইথিওপিয়ার নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু নীতিটির কৌশলগত তাৎপর্য স্পষ্ট। লোহিত সাগরে যেসব রাষ্ট্রের সরাসরি উপকূল রয়েছে, সমুদ্রটির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় তাদের বিশেষ ভূমিকা থাকা উচিত—এমন একটি সাধারণ অবস্থান তৈরি হয়েছে।
জিবুতির অনুপস্থিতিও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ইথিওপিয়ার প্রধান সামুদ্রিক যোগাযোগপথ হিসেবে জিবুতির বিশেষ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির মিসরের সঙ্গেও উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে এবং এটি নিজেই লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী রাষ্ট্র। ফলে আল-আলামিনের চার দেশের কাঠামোর বাইরে থাকা মানেই বৃহত্তর লোহিত সাগরীয় সমীকরণ থেকে জিবুতির বিচ্ছিন্নতা নয়। বরং এটি দেখায় যে চার দেশের কাঠামোটি আঞ্চলিক পরিসরের তুলনায় বেশি সীমিত।
নীলনদের ক্ষেত্রেও ঘোষণাটি একই কৌশল অনুসরণ করেছে। গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁস ড্যামের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনার নীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আগাম অবহিতকরণ, পরামর্শ, ঐকমত্য এবং অন্য দেশের স্বার্থের ক্ষতি না করার নীতি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে ভাটির দুই দেশের বিদ্যমান পানি ব্যবহারে ক্ষতিকর একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে।
এভাবে মিসর-ইথিওপিয়া বিরোধকে কেবল দুই দেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে আন্তর্জাতিক নদী আইনের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইথিওপিয়ার নাম না থাকার তাৎপর্য
আল-আলামিনের ঘোষণায় সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো ইথিওপিয়ার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। অথচ বৈঠকের সময় ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া ও মিসরের মধ্যে উত্তেজনা ছিল তীব্র। তিগ্রেতে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে। ইথিওপিয়া অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিসর আদ্দিস আবাবার বিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন করছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কও অবনতির দিকে গেছে। একই সময়ে মিসর ও ইথিওপিয়া পরস্পরের কূটনীতিক বহিষ্কার করেছে।
তারপরও চার দেশের ঘোষণায় তিগ্রে, তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট, ফানো, অরোমো লিবারেশন আর্মি কিংবা ইথিওপিয়ার বিরোধী শক্তিগুলোকে বিদেশি সহায়তার অভিযোগ—কোনোটিরই উল্লেখ নেই। চার দেশ চাইলে ইথিওপিয়ার অভিযোগের সরাসরি জবাব দিতে পারত। তারা তা করেনি। বরং আঞ্চলিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
এটাই এই নতুন সমীকরণের কূটনৈতিক শক্তি। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করছে না। বরং কয়েকটি অভিন্ন নীতির চারপাশে নিজেদের অবস্থান সমন্বিত করছে।
পরবর্তী পদক্ষেপই আসল পরীক্ষা

আল-আলামিন বৈঠকের নেতারা ঘোষণার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিয়মিত, অথবা পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী, বৈঠক করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কারণ একটি বৈঠককে কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু নিয়মিত পরামর্শের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি হলে তা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতাকে ধারাবাহিক রূপ দিতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি অবশ্য এখনো সাধারণ পর্যায়ে রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট অর্থায়ন প্যাকেজ, অবকাঠামো প্রকল্প বা বাণিজ্যিক করিডরের ঘোষণা হয়নি। তবু অর্থনৈতিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত আল-আলামিনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ভাষার ওপর নয়, বরং তৈরি হওয়া কাঠামো কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর। চার দেশ নিয়মিত সমন্বয় করতে পারবে কি না, বাস্তব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে উঠবে কি না এবং ইথিওপিয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তাদের অভিন্ন অবস্থান কতটা স্থায়ী থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ।
এই মুহূর্তে তাই আল-আলামিনকে নতুন কোনো জোটের জন্ম হিসেবে দেখার চেয়ে মিসর, সুদান, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যে একটি উদীয়মান আঞ্চলিক সমন্বয়ের সূচনা হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ। এর ভিত্তি সামরিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, জাতীয় প্রতিষ্ঠান, লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পানি আইনের মতো অভিন্ন স্বার্থ। এই সমন্বয় কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।












