একজন সোভিয়েত গুপ্তচর, বিপ্লব-পরবর্তী ইরান এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান—এই তিনের গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বেন ম্যাকইনটায়ারের বই ‘রেডউড’। এতে উঠে এসেছে কীভাবে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির কর্মকর্তা ভ্লাদিমির কুজিচকিন ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্সের সঙ্গে যুক্ত হন এবং তাঁর দেওয়া গোপন তথ্য ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিগত সংকট, গুপ্তচরবৃত্তির জটিল কৌশল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে বইটি তুলে ধরেছে শীতল যুদ্ধের এক নাটকীয় অধ্যায়।
কে ছিলেন ভ্লাদিমির কুজিচকিন
ভ্লাদিমির কুজিচকিন ছিলেন কেজিবির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ইরানের রাজধানী তেহরানে দায়িত্ব পালন করার সময় দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটে। শাহের শাসনের পতনের পর নতুন ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। সেই অস্থির সময়ে কুজিচকিন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরের দুর্নীতি ও নিষ্ঠুরতা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
তাঁর ব্রিটেনের পক্ষে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সংকটও ভূমিকা রেখেছিল। দাম্পত্য জীবনের সমস্যা এবং শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা চান।
১৯৮১ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি পেরিয়ে ইরান থেকে পালিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থায় তাঁর সাংকেতিক নাম ছিল ‘রেডউড’।
গুপ্তচর নিয়োগের পেছনে অদ্ভুত ঘটনা
কুজিচকিনকে নিজেদের পক্ষে আনার ঘটনাটি ছিল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি কিছুটা অপ্রত্যাশিত। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্বেগের মধ্যে ছিল শারীরিক সমস্যা সমাধানের আকাঙ্ক্ষা। এমনকি তিনি জ্যোতিষীর পরামর্শও চেয়েছিলেন এবং একটি নির্দিষ্ট দিনে খৎনা করানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাঁকে শান্ত রাখতে ভিটামিনের নামে নিষ্ক্রিয় বড়ি পাঠিয়েছিলেন। কুজিচকিন ভেবেছিলেন, এসব ব্যবস্থা তাঁর সমস্যার সমাধানে কাজে লাগতে পারে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং তাঁকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছিল।
এই ঘটনাগুলো দেখায়, গুপ্তচরবৃত্তির জগৎ সব সময় নিখুঁত পরিকল্পনা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। অনেক সময় ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভুল বোঝাবুঝি এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তও বড় অভিযানের গতিপথ নির্ধারণ করে।
পালানোর অভিযানে ছিল ঝুঁকি ও improvisation
কুজিচকিনের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইয়ান ম্যাকক্রিডিকে ইরানি নজরদারি এড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। আশপাশের কথোপকথন আড়াল করতে তিনি ফারসি ভাষার বেতার সম্প্রচার জোরে চালাতেন এবং কলের পানি ছেড়ে রাখতেন।
কুজিচকিন যখন তুরস্ক হয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথে, তখন আশঙ্কা ছিল কেজিবির লোকজন তাঁকে অপহরণ করে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ব্রিটিশ পক্ষের প্রস্তুতিও ছিল অপ্রচলিত ধরনের। এক কর্মকর্তাকে বড় পিতলের বাতি হাতে নিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যাতে আক্রমণকারী এলে সেটি দিয়ে প্রতিরোধ করা যায়।
এসব ঘটনা গুপ্তচরবৃত্তির বাস্তব চিত্রের একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে। বাইরে থেকে অভিযানকে অত্যন্ত পরিকল্পিত মনে হলেও বাস্তবে অনেক সময় সীমিত সুযোগের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ভুল ধারণার সুযোগ নিয়েছিল গোয়েন্দারা
ইরানে ব্রিটিশ গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে কেজিবির ধারণাও পুরোপুরি সঠিক ছিল না। সোভিয়েত কর্মকর্তারা মনে করতেন, তেহরানে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস ব্যারিংটনই এমআইসিক্সের প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এই দায়িত্বে ছিলেন তুলনামূলকভাবে নিরস ও আড়ালে থাকা কর্মকর্তা ম্যাকক্রিডি।
ব্যারিংটন নিজেও গোয়েন্দা কার্যক্রমের তদারকিতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন না। ফলে তাঁর পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ভুল ধারণা ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রকৃত ভূমিকা আড়াল করতে সাহায্য করেছিল।
এই ঘটনাটি দেখায়, গুপ্তচরবৃত্তিতে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রতিপক্ষ কী বিশ্বাস করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভুল অনুমান কখনো কখনো গোয়েন্দা সংস্থার জন্য বড় সুবিধা তৈরি করে।
কুজিচকিনের তথ্যের প্রভাব পড়েছিল ইরানের রাজনীতিতে
কুজিচকিনের দেওয়া তথ্য শুধু গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ কাজে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সোভিয়েত-সমর্থিত কমিউনিস্ট অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন উদ্বিগ্ন ছিল। সে কারণে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া কমিউনিস্ট তৎপরতার তথ্য ইরানের শাসকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়।
এরপর ইরানে ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় চার হাজার থেকে বারো হাজার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইসলামপন্থী শাসকদের ক্ষমতা আরও সুসংহত হয়।
এই পরিণতি কুজিচকিনকে গভীরভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়। ২০০৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের রাজনৈতিক প্রভাব এবং পরবর্তী হত্যাযজ্ঞের দায় নিয়ে তাঁর মানসিক যন্ত্রণা গুপ্তচরবৃত্তির নৈতিক জটিলতাকে সামনে নিয়ে আসে।
বইটিতে শীতল যুদ্ধের অজানা দিক
বেন ম্যাকইনটায়ারের ‘রেডউড’ বইয়ে গুপ্তচরদের ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্বের পাশাপাশি গোপন অভিযান পরিচালনার বাস্তব পদ্ধতিও তুলে ধরা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গুপ্তচরদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
বইটি তৈরির সময় এমআইসিক্স আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা করেনি। তবে কুজিচকিনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ম্যাকক্রিডি লেখককে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। জীবিত কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার পরিচয়ও ছদ্মনামে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এর ফলে বইটি শুধু একজন গুপ্তচরের পলায়নের কাহিনি নয়; বরং ক্ষমতা, আনুগত্য, ব্যক্তিগত সংকট এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘাতের একটি বিবরণ হয়ে উঠেছে।
গুপ্তচরবৃত্তির আড়ালে মানুষের গল্প
‘রেডউড’ দেখায়, গুপ্তচরবৃত্তি শুধু গোপন নথি সংগ্রহ কিংবা শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের ভয়, ব্যক্তিগত দুর্বলতা, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং এমন সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব বহু মানুষের জীবনে পড়ে।
কুজিচকিনের পলায়ন ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও তাঁর তথ্যের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেই তথ্যের ভূমিকা তাই একই সঙ্গে গোয়েন্দা সাফল্য ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রশ্ন সামনে আনে।
শীতল যুদ্ধের এই অধ্যায় মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গোপন তথ্যের মূল্য কখনো কখনো অসংখ্য মানুষের জীবনের ওপর নির্ভর করে।












