শরতের আগমনে ঢাকার পুরোনো পাড়াগুলোতে একসময় দুর্গাপূজার আয়োজন ঘিরে তৈরি হতো বিশেষ পরিবেশ। জমিদারবাড়ির উঠান, পারিবারিক মন্দির, প্রতিমা তৈরির কারিগর এবং ধর্মীয় আচার—সব মিলিয়ে পূজা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ঊনবিংশ শতকের ঢাকা সম্পর্কে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: কলকাতার মতো দুর্গাপূজা তখন ঢাকার সবচেয়ে বড় বা সর্বজনীন উৎসব ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
বরং পুরোনো ঢাকার ইতিহাসে দুর্গাপূজার চিত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময়। কোথাও ধনী পরিবারের উদ্যোগে পূজার আয়োজন হতো, কোথাও মন্দির ও স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিল উৎসব। অন্যদিকে মহররম, ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী ও বৈষ্ণবীয় অনুষ্ঠানও নগরের সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকায় দুর্গাপূজার ইতিহাস তাই শুধু প্রতিমা, পূজামণ্ডপ কিংবা ধর্মীয় আচার নিয়ে নয়; এটি নগরের সামাজিক বিন্যাস, জমিদারি সংস্কৃতি, ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ঔপনিবেশিক আমলে বদলে যাওয়া জনজীবনের ইতিহাসও।
ঢাকার দুর্গাপূজার শিকড় কতটা পুরোনো?
ঢাকায় দুর্গাপূজার সূচনা ঠিক কোন সময়ে, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গার তীরে দুর্গাপূজা দেখেছিলেন। পূজার ঢাকের শব্দ যত দূর শোনা গিয়েছিল, তত দূর পর্যন্ত শহরের সীমানা নির্ধারণের ধারণা তাঁর মাথায় আসে—এমন গল্পও প্রচলিত রয়েছে।

তবে এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। সমসাময়িক নথিতে এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে এটিকে ঢাকার দুর্গাপূজার সূচনার নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজার ঐতিহ্য বহু শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়েছে। জমিদার ও ধনী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যক্তিগত দুর্গাপূজা বিশেষ গুরুত্ব পায়। পরে বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে পূজার আয়োজনের বিস্তার ঘটে। ঢাকার ক্ষেত্রেও এই বৃহত্তর বাংলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রাসঙ্গিক, যদিও কলকাতা বা নদীয়ার পূজার ইতিহাস সরাসরি ঢাকার ইতিহাসের বিকল্প নয়।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকা: সব উৎসবের কেন্দ্রে ছিল না দুর্গাপূজা
ঢাকার ঊনবিংশ শতকের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ পাওয়া যায় চিকিৎসক ও লেখক জেমস টেলরের A Sketch of the Topography and Statistics of Dacca গ্রন্থে। ১৮৪০ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে শহরের ভূপ্রকৃতি, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং বিভিন্ন উৎসবের বিবরণ রয়েছে।
ঢাকার উৎসব নিয়ে তাঁর বিবরণে মহররম, বেরার উৎসব এবং বৈষ্ণবীয় আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু দুর্গাপূজাকে শহরের প্রধান উৎসবগুলোর মধ্যে আলাদা করে তুলে ধরা হয়নি। এ তথ্য থেকে অবশ্য বলা যায় না যে তখন ঢাকায় দুর্গাপূজা হতো না। বরং বোঝা যায়, ঊনবিংশ শতকের ঢাকার উৎসবজীবন ছিল বহুমাত্রিক এবং দুর্গাপূজা তখন নগরের একমাত্র প্রধান উৎসব ছিল না।
পরবর্তী স্মৃতিচারণেও ঢাকার জনজীবনে ঝুলনযাত্রা ও জন্মাষ্টমীর গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে। ফলে দুর্গাপূজার ইতিহাস লিখতে হলে শুধু পূজার আয়োজনের বিবরণ নয়, একই সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের কথাও বিবেচনায় নিতে হয়।
জমিদারবাড়ির পূজা ও সামাজিক মর্যাদা
ঊনবিংশ শতকের বাংলায় দুর্গাপূজা অনেক ধনী জমিদার ও অভিজাত পরিবারের সামাজিক মর্যাদা প্রকাশের উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল। বিশেষত কলকাতায় প্রভাবশালী বাঙালি পরিবারগুলো বড় আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ, সামাজিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাব তুলে ধরত। ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও ইউরোপীয় অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানোও এসব আয়োজনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল।
ঔপনিবেশিক আমলের চিত্রকর্ম, ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং গবেষণায় কলকাতার এই আড়ম্বরপূর্ণ পারিবারিক পূজার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তবে সেই বিবরণকে ঢাকার প্রতিটি জমিদারবাড়ির পূজার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না।

ঢাকার ক্ষেত্রে সূত্রাপুরের পুরোনো অভিজাত বসতি এবং ধনী হিন্দু পরিবারের ব্যক্তিগত পূজার প্রসঙ্গ বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু কোন পরিবার কোন সালে পূজা শুরু করেছিল, আয়োজনের ব্যয় কত ছিল, কারা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন কিংবা কোন পূজা সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে নির্দিষ্ট পারিবারিক দলিল ও সমসাময়িক নথি প্রয়োজন।
তবু বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়: জমিদারবাড়ির পূজা ছিল ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সামাজিক পরিচিতদের একত্র হওয়ার উপলক্ষ। বাড়ির আঙিনায় পূজার আয়োজন একটি পরিবারের ধর্মীয় পরিচয়কে দৃশ্যমান করত এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করত।
প্রতিমা, কারিগর ও পূজার প্রস্তুতি
দুর্গাপূজার ইতিহাসে প্রতিমাশিল্পের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশ, খড়, মাটি এবং প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি, তার ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়া, শুকানো এবং রং করার মতো কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিমা প্রস্তুত করা হতো। এই কাজে কুমার ও মৃৎশিল্পীদের দক্ষতা প্রয়োজন হতো।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকায় দুর্গাপূজার প্রতিমা কোন কোন পাড়ায় তৈরি হতো, কোন পরিবার বা কারিগরগোষ্ঠী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং প্রতিমা তৈরির উপকরণ কোথা থেকে আসত—এসব বিষয়ে আরও স্থানীয় ইতিহাস ও নথি অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। বর্তমানের প্রতিমা তৈরির পদ্ধতি দেখে অতীতের সব বিবরণ অনুমান করা ঠিক হবে না।
তবে প্রতিমা নির্মাণের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি কারুশিল্প, পারিবারিক পেশা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সম্পর্ক ছিল—বাংলার দুর্গাপূজার বৃহত্তর ঐতিহ্য এই বিষয়টি স্পষ্ট করে। পূজার আয়োজন যত বড় হতো, প্রতিমা, সাজসজ্জা, পূজার উপকরণ এবং অতিথি আপ্যায়নের জন্য তত বেশি মানুষের শ্রম ও দক্ষতার প্রয়োজন পড়ত।
পূজার সামাজিক পরিসর
দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার হলেও এর সামাজিক পরিসর ছিল বিস্তৃত। পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়া, আত্মীয়স্বজনের আগমন, অতিথি আপ্যায়ন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসবের মধ্য দিয়ে পূজা সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের উপলক্ষ হয়ে উঠত।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকায় এই সামাজিক পরিসর ঠিক কতটা বিস্তৃত ছিল, তা অঞ্চল ও আয়োজনভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোনো ধনী পরিবারের পূজা হয়তো বাড়ির অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল, আবার কোনো আয়োজনের সঙ্গে আশপাশের মানুষের অংশগ্রহণও যুক্ত থাকতে পারে। প্রত্যেকটি পূজাকে একই ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
এখানে জমিদারি ও অভিজাত সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও বিবেচনায় রাখতে হয়। বড় আয়োজনের মাধ্যমে সম্পদ ও মর্যাদা প্রদর্শনের প্রবণতা বাংলার ঔপনিবেশিক সমাজে দেখা গেলেও, দুর্গাপূজার ধর্মীয় তাৎপর্যকে শুধু আড়ম্বর বা প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। ভক্তি, পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়—সবই এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।

কলকাতার প্রভাব ও ঢাকার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য
ঊনবিংশ শতকে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বাংলার প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। সেখানে দুর্গাপূজাকে ঘিরে ধনী বাঙালি পরিবারগুলোর প্রতিযোগিতা, ইউরোপীয় অতিথিদের উপস্থিতি এবং আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন নিয়ে বহু সমসাময়িক বিবরণ পাওয়া যায়।
ঢাকার সঙ্গে কলকাতার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। কিন্তু দুই শহরের জনবিন্যাস, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক জীবনে পার্থক্যও ছিল। ফলে কলকাতার পূজার জাঁকজমক দেখে ঢাকার দুর্গাপূজার একই রকম ব্যাপকতা ছিল বলে ধরে নেওয়া যায় না।
ঢাকার ইতিহাসের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য, পুরোনো নগরপাড়া, স্থানীয় জমিদার ও অভিজাত পরিবারের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থান। দুর্গাপূজার ইতিহাস এই নগর বাস্তবতার মধ্যেই খুঁজতে হবে।
শতকের শেষভাগে নতুন সময়ের ইঙ্গিত
ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে বাংলার শিক্ষিত সমাজে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চিন্তার বিকাশ ঘটে। ধর্মীয় প্রতীক, মাতৃভাবনা এবং দেশীয় পরিচয়ের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়। তবে দুর্গাপূজা কীভাবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, তার সবচেয়ে স্পষ্ট ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো পরবর্তী সময়ের, বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই শতকের শেষভাগের ঢাকায় দুর্গাপূজার আয়োজনকে সরাসরি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করার আগে স্থানীয় সংবাদপত্র, রাজনৈতিক সংগঠনের নথি এবং সমসাময়িক ব্যক্তিগত লেখার প্রমাণ প্রয়োজন।
ঢাকার ক্ষেত্রে এই অনুসন্ধান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে নগরের শিক্ষিত সমাজ, সংবাদপত্র এবং সামাজিক সংগঠনের বিকাশ ঘটছিল। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবের সম্পর্ক খুঁজে দেখা গেলে ঢাকার দুর্গাপূজার ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে।
ইতিহাসের যে অধ্যায় এখনো অনুসন্ধানের অপেক্ষায়

ঊনবিংশ শতকের ঢাকার দুর্গাপূজার ইতিহাস পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে হলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। শহরের কোন কোন পরিবারে নিয়মিত পূজা হতো? সেসব পূজার প্রাচীনতম দলিল কোনটি? স্থানীয় সংবাদপত্রে পূজার খবর কতটা প্রকাশিত হতো? প্রতিমাশিল্পী ও পূজার উপকরণ সরবরাহকারীদের পরিচয় কী ছিল? এসব আয়োজনের সঙ্গে আশপাশের মানুষের সম্পর্ক কেমন ছিল?
পুরোনো সংবাদপত্র, পারিবারিক দলিল, জমিদারি হিসাব, মন্দিরের নথি এবং সমসাময়িক ভ্রমণবৃত্তান্ত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে। বিশেষ করে ঢাকার পুরোনো পাড়ার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা এবং ঊনবিংশ শতকের প্রশাসনিক বিবরণ মিলিয়ে দেখলে পূজার স্থান, সময় ও সামাজিক পরিসর সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব।
ঊনবিংশ শতকের ঢাকায় দুর্গাপূজা ছিল বৃহত্তর বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তবে এর নিজস্ব ইতিহাস কলকাতার জাঁকজমকপূর্ণ পূজার বিবরণ দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। ঢাকার পূজার ইতিহাসে পারিবারিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় ধর্মীয় জীবন, নগরের সামাজিক বৈচিত্র্য এবং পরিবর্তনশীল ঔপনিবেশিক সমাজ—সবকিছুরই স্থান রয়েছে।
এই ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে প্রয়োজন আরও প্রাথমিক নথি ও স্থানীয় গবেষণা। কারণ ঢাকার অতীতকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হলে শুধু প্রচলিত কাহিনি নয়, দলিলসমর্থিত তথ্য এবং ইতিহাসের অনিশ্চিত অংশগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।












